Wednesday, October 20, 2021

দোলনচাঁপা - কুহেলী দাশগুপ্ত

দোলনচাঁপা

- কুহেলী দাশগুপ্ত

  
 বালিশে মাথা রেখে পাশ ফিরে শুয়ে তিতির ভাবনার ঝড় তুলে হারিয়ে যায় কোন সে কালের স্মৃতির অতলে। চোখের পাতা ভিজিয়ে জলের ধারা বালিশের কভারে গড়িয়ে পড়ে। জ্যাঠতুতো দিদির কাছে দুঃসংবাদ পেয়ে, সন্ধ্যে থেকেই মন উদাস হয়ে আছে। অনি আপিস থেকে ফেরার পর সেভাবে আজ আর কথা হয় না। অনিমেষ নিজে বকে চলে রোজকার মতো । তিতির আজ মন দিয়ে সব শুনছে না।"কি হোল আজ তোমার? কোন কথা নেই! শুধু হুঁ, হাঁ করছ!"-বলে অনি। "মাথাটা আজ বড্ড ধরেছে অনি। তাই ভালো লাগছে না। আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ব।"-এই বলে কিচেনে যায় তিতির। দু'বছরের সংসার এদের। দুজনের ভালোই ভাব চলে। অনিমেষ অনেকটাই ম্যাচিওর, তিতিরের কিছু ছেলেমানুষির কাছে।এখনো ছেলেপুলের হাসি কান্নার কলরবে এদের ঘর মেতে ওঠেনি।তিতির একটা স্কুলে গান শেখায়। অনিমেষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কর্পোরেশনে  চাকরি করে।দুজনের ভাব ভালোবাসায় খুনসুটি চলে । একে অপরের লেগ পুলিঙ  করে মজা পায়। তিতিরের চুপ চাপ থাকাটা অনিকে একটু ভাবাচ্ছে। তবে মাথা ধরার অজুহাত ও ফেলে দেওয়ার নয়।রাতের খাওয়া পর্ব কোনরকমে সেরে তিতির আজ শুয়ে পড়ে। অনি কিছুক্ষণ  টিভি দেখে, খবর শুনে তারপর শুতে যাবে। 
      জানালার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে তিতির। আজ ওর জ্যাঠতুতো দিদি তনয়ার কাছে ঋভুদার অ্যাকসিডেন্ট এর খবরটা জানার পর থেকে মন জুড়ে স্মৃতির তোলপাড় চলছে। তনুদির বিয়ের পর দিদির শ্বশুর বাড়িতে যাতায়াতের সূত্রেই খভুদার কাছাকাছি আসা। তনুদির খুড়তুতো দেওর ঋভু তখন কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। তিতির উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ছুটি কাটাতে দিদির বাড়ি।জামাই দাদা, মেসো মাসিমা সবাই তিতিরকে ভালোবাসে। মাঝে মাঝে গানের আসরে মেতে ওঠে  সবাই। ঋভু ভালো তবলা বাজাতো, গান ও জানতো। তিতিরের গান শুনে মুগ্ধ ঋভু একটার পর একটা গানের আবদারের পসরা সাজায়। শেষে তিতির বিরক্ত হয়ে বলে,"নিজে যা জানো, তাই একটু শুনিয়ে ধন্য করো তো ঋভুদা।শুধু আমি একাই গাইবো! তিতিরের সাথে সুর মিলিয়ে তনুদি ও বলে,"কিরে ঋভু, শুধু আমার বোনটাকে গাইতে বলবি?নিজেও কিছু শোনা।" ঋভু গেয়ে যায়,"তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা"-মাঝে মাঝে অাড়চোখে চেয়ে দেখা, তিতির যেন হৃদয়ে কিসের তোলপাড় অনুভব করে। পরের গানটা গাইতে গিয়ে ঋভুর ঠোঁটের মৃদু হাসির রেশ, যেন কারো মনে ঝড় বইয়ে দেয়ার চেষ্টা।"সুন্দরী গো দোহাই , দোহাই মান কোরো না"-গান শোনার মাঝে তিতির নিজেকে হারিয়ে ফেলে। সেবার একরাশ ভালো লাগার রেশ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল তিতির।এর পরই কলেজে ভর্তির তোড়জোড় শুরু হোল। তিতির ফিজিক্স এ অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হোল। পড়াশুনো, কলেজের অ্যাটেনডেন্স সব নিয়ে ব্যস্ত তিতির । এবার জামাই দাদার বোন রিখিয়ার বিয়ে। বাড়িতে সবাই নিমন্ত্রিত। সেবার মা বাবা, জেঠু, জ্যাঠাইমা সাথে তিতির। বিয়ে বাড়িতে অতিথিদের ভীড়ের মাঝে ও ঋভু কখন পাশে এসে বলে,"এই অধমের কি জায়গা হবে?একটু খানি?"
তিতির লজ্জা পেয়ে বলে, "এই বাড়িতে এতো জায়গা, আর তুমি জায়গা চাইলে আমার কাছে!
--"-চাইলাম তো।তোমার কাছেই তো। তোমার মনে।"
--"সেতো কবেই হারিয়েছি"-বলেই তিতির ছুটে পালায়। 
আড়ালে , আড়ালে চার চোখের আভাসে, ইশারায় মন দেয়া নেয়া চলে। 
 তনুদিদের বাগানে দোলন চাঁপার গাছ ভর্তি ছিল। কি মিষ্টি গন্ধ! তিতিরের মন ভরে যেত। বিয়ের দিন সে শাড়ী পড়ে খোঁপায় দোলন চাঁপা গুঁজবে ঠিক করেছে।রিখিয়ার বিয়ের দিন নীল বালুচরি পড়ে তিতিরকে অপরূপা লাগছিল।সাথে কুন্দনের গয়না। বিকেলে দোলন চাঁপার আধফোটা কুঁড়ি এনে জলের ছিঁটে দিয়ে ড্রেসিং টেবিলে রেখেছিল। সাজ পর্ব শেষে ফুল নিতে গিয়ে দেখে নেই। দরজায় দাঁড়িয়ে ধুতি পাঞ্জাবী পড়া ঋভু দা। বলে, "কিছু খুঁজছ?"
---ফুল রেখেছিলাম, খোঁপায় দেবো। এইখানে ছিল। ---যদি আমি খুঁজে দিই? কি দেবে?
----সে পরে ভাববো, আগে তো দাও!
--তুমি পেছন ঘুরে দাঁড়াও , আমি খুঁজে দিচ্ছি।
---বাপরে! খোঁজার কি ছিড়ি! আমায় পেছন ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
তিতির পেছন ঘুরে দাঁড়ায়,ঋভু খোঁপায় দোলনচাঁপা গুঁজে দিল। "এটাই আমার প্রাপ্তি"---বলে ঋভু
---খুব বাজে হোল ঋভুদা। আমার ফুল লুকিয়ে এখন মজা করা হচ্ছে?
---তোমায় এই সাজে দেখবো বলেই তো......
তিতির মুচকি হেসে পালিয়ে গেল।সেদিন বিয়ে বাড়িতে দুজনেই নজরে নজর মিলিয়ে মন দেয়া নেয়ার খেলায় মেতেছিল। ভালো লাগা মুহূর্ত গুলি যেন নিমেষেই শেষ হয়ে যায়।পরদিন কনে বিদায় পর্ব মিটিয়ে অতিথিদের ঘরে ফেরার পালা। এক সময় ঋভু এসে তিতিরের হাতে একটা খাম দিয়ে বলে," এটা পড়ে দেখো, এখন নয় ,পরে"। তিতির লজ্জাবনত হয়ে খামটা নিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। দুরু দুরু বুকে , খুব ইচ্ছে ছিল খুলে পড়ার। নাহ্, বাড়ি গিয়েই খাম খুলবে।
         সেদিন বিকেলে তিতির পরিবার সমেত বাড়ি ফেরে। ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে খামটা খোলে।  হৃদয়ে তখন তোলপার চলছে। পুরে চিঠিতে শুধু ভালোবাসার ঝড় বইয়ে দিয়েছে। শেষে লেখা ,"নয়ন সম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই"।আবার লেখা, "নয়ন তারা তুমি আমার, আছো দুটি নয়ন জুড়ে"। তিতিরের মুখ ,চোখ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। সেদিন রাতে না ঠিক ভাবে খাওয়া , না ঘুমানো। ক'দিন এমন উদাসী মন নিয়ে ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক  নিয়মে ফিরে যাওয়া । পড়াশোনার ব্যস্ততা , পরীক্ষা সব কিছুর চাপ সামলে তিনটি বছর পেরিয়ে যায়। মাঝে কয়েকবার তনুদি এলে, এক আধবার ঋভুদার কথা উঠেছে। ঋভুদা একটি প্রাইভেট সংস্থায় জয়েন করেছে। মাইনে মোটামুটি পাচ্ছে। তিতিরের বিয়ের কথা চলছিল যখন, জ্যাঠাইমা একবার ঋভুদার কথা তুলেছিল। তিতিরের বাবা সরকারী চাকুরে ছাড়া মেয়ে বিয়ে দেবেন না জানিয়েছেন। তিতিরের কানেও এসেছে কথাটা। বাবার কথার অন্যথা হবার জো নেই। তিতির শুধু একবার বলেছিল, "চাকরি পাই , তারপর না হয় বিয়ে দিও"। বাবা ও মায়ের মত ছিলো না।"সে তুই বিয়ের পর যা হয় করবি"। অবশেষে বাবার আপিসের সুধীন কাকুর ভাগনে অনিমেষ এর সাথেই তিতিরের বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হয়। তনুদির শ্বশুরবাড়িতেও সবাই নিমন্ত্রিত। বিয়েতে সবাই এলে ও ঋভু অাসেনি। চিঠিটা তিতির ছিঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু মনের মাঝে  আঁকা ছবি কি মুছলো তাতে?
     বিয়ের পর , অনিমেষ তিতিরকে  চেনা জানার সুযোগ দিয়ে অনেকটা কাছে টেনে নিয়েছে। শ্বশুর শাশুড়ী নিয়ে  ঘর সংসারে ভালোই মেতে যায় তিতির। বাগানের শখ ছিল, তাই অনেক গাছ লাগিয়েছে তিতির। সাথে দোলন চাঁপা। ফুলগুলি ফোটে যখন মন তার আনন্দে ভরে যায়। মিষ্টি গন্ধ, আর  কিছু স্মৃতি।
            আজ ও ফুটেছে দোলনচাঁপা। জানালা দিয়ে মিষ্টি গন্ধ আসছে। কিন্তু এই গন্ধ যেন ব্যাথা ভরা। ঋভুদা নেই। বাইক চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় বাসের ধাক্কায় ছিটকে যায়। স্পট ডেথ। তনুদির ফোন পেয়ে তিতিরের অস্থির লাগে সারাটা দিন। হাওয়ায় ভেসে আসা দোলনচাঁপার গন্ধ  যেন কার স্পর্শ মনে করায়! মনে হয় না,সে নেই। রাতে ফোটা শুভ্র ফুলেরা তাকে কাছে টানে। এ কষ্ট কাওকে বলার নয়। আকাশের তারা গুনে রাত কেটে যায়।

No comments:

Post a Comment