Tuesday, October 19, 2021

শঙ্খ-ধ্বনি - সৌম্য ঘোষ

শঙ্খ-ধ্বনি

- সৌম্য ঘোষ


    " আমার জন্য একটুখানি কবর খোঁড়ো সর্বসহা
      লজ্জা লুকোই কাঁচা মাটির তলে---
      গোপন রক্ত যা-কিছুটুক আছে শরীরে, তার
      সবটুকুতেই শস্য যেন ফলে।"
                     ( 'কবর'/ "দিনগুলি রাতগুলি")

          বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকরতা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতা, দেশভাগের যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু সমস্যা আর তারই মধ্যে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন। এই স্বপ্নভঙ্গ ও নতুন স্বপ্ন গড়ার যন্ত্রণার জরাতুর কালে আবির্ভাব শঙ্খ ঘোষের ( ৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৩২)। পঞ্চাশের দশকে বাংলা কবিতার নতুন পথ চলা শুরু হয়। শুরু হয় আত্মনির্ভর আধুনিকতার। নিজস্ব পথ নির্মাণ করে শঙ্খ ঘোষ বাংলা কবিতায় অর্জন করেন একটি স্বতন্ত্রতা। আত্মস্থ করেছেন বাংলা ভাষার ঐতিহ্যকে। 'ঐতিহ্য' কেবল অতীত নিয়ে গড়ে ওঠে না, ঐতিহ্য সাম্প্রতিক কালখন্ডের সঙ্গেও যুক্ত। এও এক ঐতিহাসিকবোধ। যে বোধ শুধু অতীতের অতীতত্ত্বে অনুভূত নয়, তার উপস্থিতি সমকালের অনুভবেও। এই বোধ সঞ্চারিত হলেই একজন কবি বা লেখকের তাঁর সমসময়ের চেতনা নিয়েই শুধু লেখেন তাই নয়; তিনি লেখেন তাঁর ভাষা-সাহিত্যের অস্তিত্বের অনুভব দিয়ে 'মানব সময়ের' বোধ। আর এখান থেকেই কবির অন্তঃস্থ আত্ম-পরিচয়ের পূর্ণতা পাওয়া যায়। তিনি  ঐতিহ্যকে তাঁর সৃজনশীলতায় অঙ্গীভূত করে নেন।

               বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার শুরু হয়েছিল ত্রিশের দশকে জীবনানন্দ দাশ,  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সমর সেন প্রমুখের কাব্য প্রেয়সে। শেষ জীবনের সৃষ্টিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও আলোড়িত হয়েছিলেন প্রবল আত্মবিরোধে। এই আত্মবিরোধ ছিল তাঁর কবি জীবনের সূচনা থেকে লালন করে আসা আস্তিক্যবোধ, রোমান্টিকতার সঙ্গে বোদলেয়ার, এলিয়ট, পাউন্ডদের আধুনিক জগতের। তাই দেখি, শঙ্খ ঘোষের কবিতায় একদিকে যেমন পাওয়া যায় চেতনার দিক থেকে রবীন্দ্রনাথকে, আবার পাশাপাশি পাওয়া যায় ত্রিশের দশকের কবিদের। চল্লিশের দশকের রাজনীতি সচেতন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখরা তাঁর কবিতা ভাবনা এবং মননবিকাশকে প্রভাবিত করেছিল।
                শঙ্খ ঘোষ গদ্যেও অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর কাব্যভাবনা, শব্দভাবনা, ছন্দচেতনা নিয়ে লেখা গদ্য গ্রন্থগুলি অনন্য বিশিষ্টতা দিয়েছে।  একদিকে শব্দকে অতিক্রম করে শব্দাতীত তাৎপর্যে পৌঁছানো; অন্যদিকে বিশ্বের পটে খোঁজা। 

             শঙ্খ ঘোষ মূলতঃ কবি হলেও গদ্য লেখায় "কবিতার সৃজনশীলতা" এবং তীক্ষ্ম মননশীল যুক্তির ধারালো ঔজ্জ্বল্যে একজন সাহিত্যিক ও সমালোচক। তাঁর "ছন্দের বারান্দা"(১৯৭১),  "জার্নাল" (১৯৮৫), "এ আমির আবরণ"(১৯৮০), "ঐতিহ্যের বিস্তার (১৯৮৯) ---- প্রত্যেকটি গ্রন্থই ব্যতিক্রমী এবং কবি পরিচয়ে সমৃদ্ধ।  যাতে সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে আছে মেধা-দেশ-কাল-সময়- সংকট এবং আত্মপ্রশ্ন-সমালোচনা-জাগরণ। তিনি তাঁর প্রবন্ধসমূহকে "স্মৃতিলেখা", "লেখা জীবন", "কবিতা কথা", "শিল্প-সাহিত্য", "রবীন্দ্রনাথ" এবং "অন্যান্য" ----- এই ভাবে বিন্যস্ত করেছেন।

                অনুবাদক শঙ্খ ঘোষ দেশ, সমাজ, রাজনীতি, মানুষ, মানবতা, ভালোবাসা সচেতন। তাঁর সকল অনুবাদকর্মে জীবন ও ঐতিহ্যের সামগ্রিক বোধে সুস্পষ্ট ধরা পড়ে কবি-মানসের মিল। 
                তাঁর কাছে নতুন শব্দের সৃষ্টি নয়, বরং শব্দের নতুন সৃষ্টিই অভিপ্রায় ------ কবি ভালোবাসার কাছে পৌঁছান, সৃষ্টি করেন দেশকালের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে নতুন প্রেম-কবিতা। প্রবল অস্ত্যর্থকতার জন্য তাঁর সমস্ত কবিতা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে প্রেমের কবিতা ---- ভালোবাসার কবিতা।  শঙ্খ ঘোষের কবিতা সমাজ দেশকাল সংশ্লিষ্ট। সময়ের অস্থিরতার ক্ষোভ, ক্রোধ অভিমান, আত্মসংকট, বেদনার প্রগাঢ় যন্ত্রণাবোধ। আর এই কারনেই কবি শঙ্খ ঘোষ বেঁচে থাকার এবং অন্যকে বাঁচতে শেখানোর কবি।  আধুনিক, উত্তরাধুনিক পাঠ নিয়েই  কবি শঙ্খ ঘোষ সামগ্রিক অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।  বিশ্ব জগতের সঙ্গে সরাসরি আনুভূমিক, সচেতন, ইতিবাচক সংযোগ স্থাপন করেছেন। ‌
              আধুনিকতার অনেকান্তিক শর্তে-ধর্মে তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত উপলব্ধি  এবং সামাজিক উপলব্ধির সঙ্গে মিশে গেছে ---- এক নিজস্ব শঙ্খ-ধ্বনি।।

No comments:

Post a Comment