Tuesday, October 19, 2021

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (৭ম পর্ব) - অতনু দাশ গুপ্ত

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (৭ম পর্ব)

- অতনু দাশ গুপ্ত


তখন কনসেনট্রিকসে কাজের রুটিন ছিল প্রতি সোম থেকে শুক্রবার সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। আর বাকি দুইদিন ওয়ালমার্টে চলে যেতাম। কাজেই পুরো সপ্তাহে কোন ছুটি থাকতো না! প্রাথমিকভাবে কারও কোন সমস্যা মনে হওয়ার কথা নয়, আমারও মনে হয়নি। কনসেনট্রিকস এর চাকরিতে যতটা বিরক্তি বা ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো, সেটার ধকল অনেকটাই কাটিয়ে উঠতাম ওয়ালমার্টের কাজে! প্রায় বছর খানেকের কাজের অভ্যাসের কারণে ওয়ালমার্টে  গেলেও মানসিকভাবে খারাপ লাগতো না। কেন জানি মনে হয় অপর চাকরির খাটুনির পরিবর্তে ওয়ালমার্টের বাজে কাজও  ভালো লাগতো! যার কোথাও যাওয়ার পথ থাকে না সে তার ঘরের এক কোণে জানালায় বসে বাইরের সুনীল আকাশে নিজের আনন্দ খুঁজে ফেরে। ঘরের ফুটো হওয়া টিনের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির গুঁড়ি গুঁড়ি ফোটা অভাবীর কল্পলোকে বহুমূল্য মুক্তো মনে হতেই পারে !  
 সারাদিনের মানুষের অভিযোগ অনুযোগের কথা শোনাও একধরনের চাকরি হতে পারে এটা ধারণা ছিল না। হ্যাঁ, তাদের বহু সমস্যার সমাধান করতে পেরে অনেক ভালো লাগাও কাজ করেছে - অস্বীকার করার জো নেই! 

এভাবে অবিশ্রান্তভাবে কাজ করা আর্থিকভাবে স্বচ্ছতা এনে দিলেও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট তৈরি করে। আমার ক্ষেত্রেও  সেটাই হলো। একসময় সবমিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠলাম। আর ঘরে বসে কাজ করার কারণেও আমার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছিল। বাকিদের কেমন লাগে জানি না, নিতান্তই ব্যক্তিগত অভিমতের আলোকে বললাম। 
 ভাবতে লাগলাম কিভাবে এই চাকরিকে বিদায় দিয়ে অন্য কোথাও কাজ শুরু করা যায়?? ধারণা ছিল না যে নতুন চাকরির খোঁজ পাওয়া কতোটা দুষ্কর হতে পারে!! এক পরিচিত বন্ধুর সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে জানতে পারি ওদের কাজের ক্যাটাগরী বি! ওর কথা মতো রেজিউমে জমা দিয়ে এলাম ম্যানেজারের সাথে দেখা করে। ক্যাটাগরী বি হওয়ার কারণ এটা সুপারভাইজারের পদ। তখন ওখানে কর্মী নিয়োগের কথা চলছিল। ওয়ালমার্টে যে সহকর্মীর সূত্রে এখানে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছিল ও-ই জানিয়েছিল ব্যাপারটা। মূলত ভুলের গোলকধাঁধায় ফেঁসে যাবার আগের পর্যায়ে ছিলাম। এরপরই শুরু হলো মূল গল্পের সূত্রপাত যার মাশুল দিতে হচ্ছে এখনও পর্যন্ত! নতুন চাকরির প্রত্যাশায় পুরোনো বিরক্তিকর কাজকে বিদায় দিয়ে অপেক্ষায় রইলাম কবে শুরু করবো?? সব আশায় গুড়ে বালি - নিয়তি আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সরে গেল দূরে, অনেক দূরে। পুরো ঘটনার বিবরণী তুলে ধরতে আরও তিনটে পর্বও যথেষ্ট নয়! যা হয়েছিল তার সারসংক্ষেপে এই দাঁড়ায় এখন সে চাকরিতে বহাল তবিয়তে দায়িত্বরত আছে আমারই পরিচিত সহপাঠীনি! আশা করি বাকিটা নিজেরাই বুদ্ধিবলে বুঝে নেবেন। 

আর্থিক দিক থেকে ক্ষতির চেয়ে মানসিক বিষণ্নতা আর অবসাদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই অনেক কঠিন হয়ে গেল। তখন করোনা অতিমারীর থাবায় ছোট্ট শহর সিডনি প্রায় খাঁ খাঁ করছে। যে যেদিকে পারছে চাকরি নিয়ে না হয় বিনা কাজে আশেপাশের শহরে চলে গেল। কেউ কেউ তো অন্য প্রদেশেই উড়াল দিল। আমাকেও বন্ধু -বান্ধবীরা হ্যালিফ্যাক্সে চলে আসার কথা বললো। হ্যাঁ, এটা ঠিক। একটা প্রদেশের কেন্দ্র হওয়ায় ওখানে কাজের সুযোগ অনেক বেশি। কিন্তু কোন কাজ ছাড়া তল্পিতল্পা গুটিয়ে ওখানে গিয়ে আচমকা হাজির হওয়াটা অথই জলধিতে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। তাছাড়া বিশ্বের যে কোন রাজধানীর মত খরচটাও অনেক বেশি। বলা হয় কোন প্রদেশের কেন্দ্রস্হল না কি টাকার আকর??   সবখানেই টাকা উড়ে, শুধু কুড়িয়ে নিলেই হলো!! বাস্তবতা তা বলে না। 

তখন ওয়ালমার্টের মাধ্যমে হ্যালিফ্যাক্সে বদলির হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। এক শহর থেকে অন্য শহরের স্টোরে স্থানান্তরের সুযোগ আছে।  শুধু প্রয়োজন হয় স্টোর ম্যানেজারের সদিচ্ছা, সাহায্যের। বিধি বাম! জেনিফার চলে যাওয়ার পর নতুন ম্যানেজার কেটির ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার বারবার কেন হয়েছিলাম তার উত্তর আজও খুঁজে ফিরি। তবে ভাবলাম বিপদে পড়লে হয়তো সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও দিতে পারে। আমার ধারণাকে শুধু ভুল নয়, রীতিমতো দু'পায়ে মাড়িয়ে কেটি বুঝিয়ে দিল কিছু মানুষ শুধু নামেই মানুষ, কাজে এরা গুবরে পোকার চেয়েও নগণ্য, ঘৃন্য!! বুঝলেন না তো ব্যাপারটা??  বলছি - আমি ওকে হ্যালিফ্যাক্সের বিভিন্ন স্টোরে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করলাম। এটাই নিয়ম। কেটি আমাকে উল্টো পথে হাঁটার রাস্তা দেখিয়ে দিল। নিজে যোগাযোগ না করে আমাকেই বললো বাকি স্টোরগুলোর ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে। আমিও ভাবলাম, যেহেতু ও বলছে, এর মানে নিজেও কল করবে বাকি ম্যানেজারদের। কিন্তু আমি ফোনে কথা বলতেই বুঝলাম ও কিছুই করেনি। স্বাভাবিকভাবেই অন্য ম্যানেজারদের কাছে আমার কল করার ব্যাপারটা বেখাপ্পা লেগেছে - ওদের সাথে ফোনে কথা বলেই বুঝতে পারছিলাম। এভাবে মাস পার হয়ে গেলেও কোন আপডেট না পেয়ে আমি নিজের ডিপার্টমেন্ট  ম্যানেজারকে মার্ককেও বিষয়টা জানালেও কোন ফল তো হয় ই নি, বরং সে আমাকে বললো ও কারও জন্য ফোন করতে পারবে না! সবকিছু মিলিয়ে একটা সোজাসাপ্টা কাজ বেশ হযবরল হয়ে গেল কেটির চূড়ান্ত অসহযোগিতার কারণে। এভাবে দু'মাসেও কোন ফল হলো না দেখে আমি নিজেই হ্যালিফ্যাক্সের স্টোরে স্ব শরীরে গিয়ে ওখানকার ম্যানেজারদের সাথে দেখা করবো সিদ্ধান্ত নিলাম। করলামও সেটা। আমি যাওয়ার পর কেটিকে ফোন করে জানালাম, ওর সাহায্য লাগবে। কারণ ওখানকার ম্যানেজার বললো ও কেটির সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে চায়। যখন আমি ম্যানেজারের সাথে কথা বললাম, ও জানালো অনেক পদই ফাঁকা রয়েছে। এ মূহুর্তে না দেখে ওর পক্ষে বলা সম্ভব না। তবে ও কেটির সাথে আগে কথা বলবে আর অফিসের কাগজপত্র দেখে আমাকে জানাচ্ছে। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার কেটির কল পাই। আমি স্টোরের বাইরে অপেক্ষায় ছিলাম! ফোনে ও বললো, আপাতত গ্রিটার পজিশন ছাড়া আর কোন পদ ফাঁকা নেই। তাও মজুরির কোন নিশ্চয়তাও নেই। রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লাম!! আশা করি, এক্ষেত্রে আর কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না। আপনারা এতক্ষণে মূল ঘটনার সূত্রপাত, যবনিকা পতন বুঝতে পেরেছেন। সিডনি থেকে চাকরি নিয়ে বের হয়ে অন্য শহরে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল। তখন থেকেই আবেদন করে যেতে লাগলাম। একদিকে পূর্ণাঙ্গকালীন চাকরির সংকট, অন্যদিকে মহামারীর দাপট! দুই পরিস্থিতির মাঝে পড়ে চিড়েচ্যাপটা হতে লাগলাম।  মনে হতে লাগলো এ পরিস্থিতি বের হয়ে আসার কোন পথ নেই!  ওইসময় ওয়ালমার্টের কাজের ফাঁকে ফাঁকে  আমার ফেলা দীর্ঘশ্বাস হয়তো ওখানকার প্রতিটি পন্যসামগ্রিই শুনেছে! এই নাভিশ্বাস ওঠা অবস্হার আপাত সমাধা পেলাম না!! 
একজন মানুষের ব্যক্তিগত আক্রোশ আরেকজনের জন্য কতোটা ক্ষতির কারণ হতে পারে এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ  ওয়ালমার্টের বদলি আটকে যাওয়ার ঘটনা। আরও কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করি, এর জন্যে আমাদের একটু আগের দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে - প্রথমে কেটি যখন ওয়ালমার্টে জয়েন করে তখন ও আর গাসি - এ দুইজনই মূলত সিডনি ওয়ালমার্ট থেকে বদলি হয়ে এসেছিল। ওখানে কেটি ছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আর গাসি প্রডিউস ম্যানেজার। এক জায়গায় কাজ করলেও দু'জন সম্পূর্ণ বিপরীতে মেরুর মানুষ, এটা এদের কাজের ধরণে পরবর্তীতে বুঝতে পারলাম। আমি কাজের উপস্থিতি সিডিউল জমা দিলাম। একই কাজ গত এক বছর ধরে করে আসছি। পুরোনো কোন ম্যানেজার আমার সিডিউল রিজেক্ট করেনি। কেটি জয়েন করেই প্রথম যে কাজটা করলো সেটা আমার রুটিন বাতিল করা। তাও বিনা কারণে। অফিসে এসে ওর কান্ড দেখে চক্ষু চরাক! সরাসরি ওর সাথে দেখা করি। ও আমাকে জানালো গাসির সাথে দেখা করতে। কার্টের পর ও তখন নতুন ম্যানেজার হয়েছে সবেমাত্র। অফিসের কম্পিউটারে গাসিকে ঘটনা দেখাতেই ও খুব আশ্চর্য হয়ে বললো এর বিন্দুবিসর্গ কিছুই জানে না! আমাকে আশ্বস্ত করলো এর সমাধান করবে। করলোও তাই। কেটিকে বলতেই ও রুটিন মেনে নিলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর আগে কেন রিজেক্ট করা হলো?? একই ঘটনা ও আবার করলো ক্রিস্টমাসের ছুটিতে...  আবার রুটিন বাতিল। এর আগেরবার গাসি বলেছিল আমার সিডিউলে নাকি সময় যতটা দিয়েছিলাম সেটাতে কেটি অসন্তুষ্ট,  আরও বেশি সময় দিতে হবে। ওকে বুঝিয়ে বললাম,  বেশি দিই কি করে যেখানে সপ্তাহে  বিশ ঘন্টার বেশি কাজই করার নিয়ম নেই! আর এবার কেন করলো বোঝা দুষ্কর? তখন ক্লাস না থাকায় রবিবার বাদে প্রতিদিন কাজের সময় দিয়েছি, তারপরও বাতিল! পুনরায় গাসিই ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হয়ে বিপদের হাল করলো।পরেরবার গাসি বেশ আশ্চর্য হলো কেটির কান্ড দেখে! কারণ সপ্তাহের একদিন বাদে প্রতিদিন সময় দেওয়ার পরও রিজেক্ট করার কি কারণ থাকতে পারে?? 
পরের ঘটনা করোনাকালীন সময়ের- চারিদিকে লকডাউন দেওয়ার পর অধিকাংশ ক্যানাডিয়ান কর্মীরা ওয়ালমার্টে কাজ করতে আসা বন্ধ করে দিলো। ভরসার পাত্র হয়ে রইলাম এশিয়ান কর্মকর্তাগণ। আমাদের বলা হলো কোন বিরতি না দিয়েই আমরা যত ঘন্টা ইচ্ছে কাজ করতে পারবো। এছাড়া কতৃপক্ষের আর কোন উপায়ও ছিল না।  অবস্থা এমনও বেগতিক  হয়েছিল যে সিডনি ওয়ালমার্ট থেকে অনেক ভারতীয় ছেলেমেয়েদের এসে আমার স্টোরে কাজ করতে দেখেছি! 
যথারীতি আবার বাধ সাধলো কেটি!

No comments:

Post a Comment