Tuesday, October 19, 2021

লকডাউন - প্রবোধ কুমার মৃধা

লকডাউন
- প্রবোধ কুমার মৃধা

বিকেলে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর কাছে গোটা দুয়েক বাজারের ব্যাগ চাইল বিপিন বাবু।স্ত্রী একটু অবাক হলো,প্রথমত তাসের আড্ডা ছেড়ে এই সময়ে বাড়ি ফেরার কথা নয়,তার উপর হঠাৎ অসময়ে বাজারের ব্যাগ।জিঞ্জেস করল,'কি গো,এখন বাজারের ব্যাগ কী হবে?'
'আর বলো না,সরকার লকডাউন না কি ঘোষণা করেছ ,কাল থেকে গাড়ি ঘোড়া,হাট বাজার সমস্ত‌ই বন্ধ হয়ে যাবে।মানুষ জন একেবারে ঘরবন্দি হয়ে পড়বে।'সরলা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে র‌ইলো, ব্যাপারটা তার মাথায় ঢুকল না।তারপর হঠাৎ মনে পড়ল, দু-দুটো ছেলে যে বাইরে আছে, রেল বন্ধ হলে তারা বাড়ি ফিরবে কীভাবে?
দেখতে দেখতে খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।কেবল গাড়ি ঘোড়া হাট বাজার নয়,বিয়ে ,শ্রাদ্ধ,উৎসব অনুষ্ঠান সব‌ই একপকার বন্ধ,দু-চার জন মানুষ ও পথেঘাটে একত্র জুটতে পারবে না।মুখে মাস্ক ছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে বের হ‌ওয়া যাবে না।মৃতের সৎকারের ক্ষেত্রে ও অনধিক বিশ জনের বেশি যাওয়া চলবে না।

পাশের বাড়ির মেজো গিন্নি বিভাসের মা প্রায়  গলা ছেড়ে কান্নাই শুরু করল,সাত বছরের ছেলেটার ২নং কেমো হ‌ওয়ার ডেট ছিল সপ্তা খানেক পরে চেন্নাইয়ে,রিজরভেশনের টিকিট ও কাটা হয়েছিল।সর্বনাশ হয়ে যাবে!
লকডাউনের কারণে স্কুল-কলেজ সব বন্ধ,ছোট থেকে বড়ো ছেলে মেয়ে গুলো দিনের পর দিন ঘরবন্দি হয়ে পড়ে অতিষ্ট করে ছাড়ছে।কেউ কার‌ও বাড়ি যাচ্ছে না।মানুষকে দেখে মানুষের সন্দেহ আর ভয় দিন দিন যেন বেড়ে যাচ্ছে। কি জানি কার মধ্যে কোভিদ লুকিয়ে আছে, কখন অজান্তে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি সংক্রমিত হবে কিছুই বোঝার উপায় নেই।খাওয়া ঘুম আর আকাশ পাতাল চিন্তা ছাড়া তেমন কোন কাজ ও নেই।এই লকডাউন যে কবে উঠবে তার খবর কেউ বলতে পারছে না।
খবরের কাগজ পত্র আর আসে না ; ঘরবন্দি মানুষ জন বাইরের খবর সংগ্ৰহের আশায় রেডিও শুনছে,টিভির সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকছে।পাড়ার বেশ কিছু যুবক ছেলে ভিন রাজ্যে কাজ করে, কী অবস্থায় তাদের দিন কাটছে? কাজ তো নেই, কলকারখানা সব বন্ধ হয়ে গেছে, বসে বসে কতদিন চলবে? টিভিতে গতকাল দেখাচ্ছিল, বিহার থেকে বেশকিছু পরিযায়ী শ্রমিক মরিয়া হয়ে পায়ে হেঁটে মুর্শিদাবাদে বাড়ির উদ্দেশে র‌ওয়ানা দিয়েছিল,পথে পরিশ্রান্ত হয়ে অচেনা এক ফুটপাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল; গভীর রাতে আচমকা পণ্যবাহী এক ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে জনা দশেক মারা যায়, ,আহত আর ও অনেক ।
গ্ৰামের বহু যুবক যুবতী যারা কলে কারখানায় বা প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করত,সবাই কাজ হারিয়ে হতাশায ভুগছে । কেউ কার ও খোঁজ রাখতে পারছে না,ফোন করতে ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।যে বাড়িতে বয়স্ক মানুষ জন আছে, চিন্তা তদের‌ই নিয়ে বেশি।কোন রকম উপসর্গ দেখা দিলে খবর পেয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা এসে নিয়ে চলে যাচ্ছে,আর পাড়াতে নেমে আসছে একটা হাড় হিম করা আতঙ্ক ; কারণ বাচ্চা এবং বয়স্ক মানুষ প্রায় বাড়িতেই আছে।আর সব থেকে বড়ো চিন্তার বিষয় হয়েছে, হসপিট্যালে ভর্তি কোন করোনা রোগি মারা গেলে মৃতদেহ বাড়ির লোকের হাতে দেওয়া তো দূরের কথা, দেহটির শেষ পর্যন্ত কী গতি হলো তা ও জানানো হচ্ছে না।ফলে বোঝা যাচ্ছে না রোগি সত্যিই মারা গেল কি না!
                                   দু-একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা একান্ত  অসহায় গরীব দুখিদের মধ্যে কিছু কিছু ত্রাণ বিলি করছে তবে সমস্যা  দেখা দিয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবার গুলিতে, অধিকাংশই কাজ হারিয়েছে,পয়সা কড়ি পাচ্ছে না, সংসার টানা দায় হয়ে পড়েছে।
সরকারি সাহায্য মিললে ও চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট অপ্রতুল।একদিকে পেটের দায়,অন্য দিকে ‌করোনা অতিমারির রূপ নিয়ে চারদিক দিয়ে আক্রমণ. শুরু করেছে।প্রবাসীরা আপন জনের কাছে ফিরতে পারছে না।বাড়ির মানুষেরা বাড়ির বার হতে পারছে না, গৃহের গন্ডিতে শ্বাস রুদ্ধ অবস্থা।আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে এসে ও অনেকে আটকে গেছে ,ঘরে ফিরতে পারছেনা।কবে যে লকডাউন উঠবে, কবে যে আবার জনজীবন স্বাভাবিক হবে তার কোন আভাস ইঙ্গিত স্বপ্নে ও মিলছে না, কেবল দু'হাজার বিশ সালটি চারিদিকে করোনার বিষ ছড়িয়ে চলেছে।কোথায় কবে এর শেষ কেউ জানে না!

No comments:

Post a Comment