Tuesday, September 7, 2021

ইতি - তোমার আমি - বিন্দু মুখোপাধ্যায়

ইতি - তোমার আমি
- বিন্দু মুখোপাধ্যায়

মিতু ফোনে চোখ রেখে তর্জনী দিয়ে ফোনের স্কিনটা নাড়িয়ে চলেছে। কোনদিকে হুঁশ নেই! 
নন্দিনী -আরে ওরে! রাত হলো তো! খাবার নিয়ে বসে আছি, 
কখন থেকে ডাকছি,শুনতে পাচ্ছিস না?
মিতু- শুনতেই পাইনি মা!
নন্দিনী -তা তুমি কোনদিন শুনতে পাও?
 মিতু -দাও দাও! খুব খিদে পেয়েছে। জান মা, ফেসবুকে দারুণ একটা গল্প পড়লাম।
নন্দিনী - হ্যাঁ, এখন তো ঐ ফোনের মধ্যেই সব আছে!
যদিও বিষয়টা কাজের, কিন্তু আমার ফোনের সব কিছু  ভালো লাগে না। আজকাল অনলাইনে পড়াশোনা করতে গিয়ে বাচ্চারা গোল্লায় যাচ্ছে! 
আমাদের সময়..…
মিতু মাকে থামিয়ে বলল- তোমাদের সময় সব ভালো ছিলো, এই তো বলবে! 
নন্দিনী - আরে না রে বাবা! সে কথা বলছি না! ভালো বা মন্দ নয়। আমরা যখন তোদের  মত টিনএজার ছিলাম তখন বাড়ির সকলের চোখ এড়িয়ে গল্প,  উপন্যাস পড়া ছিলো ভারি কঠিন! 
মিতু - কেন? গল্প, উপন্যাস পড়া খারাপ  নাকি? 
নন্দিনী -আমরা খারাপ না ভাবলেও আমাদের বড়রা ভাবতেন ওসব বই পড়লে ছোটরা এঁচোড়ে পাকা হবে।এ সব ওদের পছন্দ ছিলো না, তাই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম।
মিতু -আর প্রেম ট্রেমও চলতো লুকিয়ে, তাই না মা!
নন্দিনী -তুমিও এঁচোড়ে পাকা হয়েছ! 
মিতু হাসতে হাসতে নিজের ঘরে চলে যায়। নন্দিনী সব গুছিয়ে শোবার ঘরে আসে। পুরনো দিনের কত স্মৃতি তাকে ঘিরে ধরলো। লাল,নীল,সাদা, গোলাপি, ক্রিম রং এর হরেক রকম চিঠির খাম আসতো সে সময়। সকাল দশটার পরই সজাগ থাকতো নন্দিনী,  কখন পিওন কাকু আসবে! কলেজ ছুটি থাকলে তো কথাই নেই, মাঠের পাশে সরু রাস্তা ধরে সেই বার্তা বাহকের প্রতীক্ষায় দিন কেটেছে কত! উজ্জ্বলের মুক্তোর মত হাতের লেখা, তার ওপর পাকা সাহিত্যিকের মত কথার বাঁধন। চিঠি তো নয়, যেন গদ্য কবিতা! অন্তরের সব আবেগ অক্ষর হয়ে কথায় কথায় কাটিয়ে দিতো কত দিন, কত রাত! জীবন্ত মন ধরা পরতো আবেশে। তার কাছে আজকের ফোন কল, ম্যাসেজ, ওয়্যাট্সএ্যাপ, ইমেল যেন প্লাস্টিকের সুন্দর ফুল ফুলদানিতে।কিছু চিঠি আজও সযত্নে আছে, গোপন বাক্সটাতে। 
নন্দিনীর কি হলো কে জানে। চট্ করে উঠে আলমারি খুলে বাক্সটা বার করলো। আগে প্রায়ই ও এই বাক্স খুলে চিঠি বার করে পড়তো,এটাই নন্দিনীর একটা হবির মত। চাবি দিয়ে গয়না বাক্স খুলল, হ্যাঁ এ বাক্সেই গয়নার সাথে চিঠিগুলিও থাকে নিশ্চিন্তে। নীল খামের পত্র, রংটা শরতের আকাশের মত হালকা নীল! 
তখনকার দিনে রাইটিং প্যাডের কাগজও ছিলো অদ্ভুত সুন্দর! আবছা ফুল,লতাপাতা, নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য। এ চিঠির কাগজে ছিলো জলছবির মত হালকা শকুন্তলার ছবি, এক গাছের তলায় মালা গাঁথার দৃশ্য! যেন যুগ যুগান্তরের প্রতীক্ষা! 
ওপর দিকে সম্বোধনে লেখা 'প্রিয়া আমার',! নিচে লেখা -ইতি, 'তোমরা আমি '
সুখ, দুঃখ, মান অভিমান, স্বপ্ন খেলা! নানা অভিব্যক্তি মূর্ত হয়ে উঠতো কাগজের স্বল্প পরিসরে! 
মিতুর ফোন হাতে চিত্কার -মা, বাবা ফোন করছে! শুনতে পাচ্ছ না?
ও হো! খাবার ঘরে ফোনটা পড়ে ছিলো ! দে দে! 
নন্দিনী -হ্যালো! কেমন আছ?
উল্টো দিক থেকে গলার আওয়াজে নন্দিনী অভিমানের সুরে - এ সপ্তাহেও  আসতে  পারবে না? এত কাজ তোমার?  কদিন থাক বাড়িতে?  থাক্ আর কিছু বলতে হবে না! 
কথার পালা শেষে নন্দিনী ফোন রাখে।কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে তার।
পাশে পড়ে থাকা চিঠিটা তুলে চোখ বোলায় আবার সে।নন্দিনীর ঝাপসা চোখে আজ শকুন্তলার ছবিটা কেমন যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

No comments:

Post a Comment