Tuesday, September 7, 2021

একজন কফিল মিয়া ও কোড়াপক্ষী (পর্ব -২) - শওকত নূর

একজন কফিল মিয়া ও কোড়াপক্ষী (পর্ব -২)

- শওকত নূর


কফিল মিয়া আমাদের বাড়িতে আশ্রিত হলেও দিন রাতের সিংহভাগ সময় তার আমাদের সাথে না কেটে বরং কাটে কোড়াপাখিদের সাথে। সকালে ঘুম থেকে জেগেই সে পাখিগুলোকে খুূূদ-পানি খাওয়ায়, বিড়বিড় করে তাদের সাথে কী সব বলে, দুপুরে বিলে নিয়ে তাদের গোসল করায়, ওড়ার বিকল্প হিসেবে খাঁচা দুটিকে রশির সাহায্যে ওঠানামা করায়। এতে কোড়াদের কী আনন্দ বা দুঃখ হয় তা বোঝা যায় না। কারণ, এমন ওঠানামার সময়ে তারা প্রত্যেকে চোখ বুঁজে ঘাড়ের লোম খাড়া করে রাখে। তারা জনসমক্ষে কখনো বাৎচিৎ করে না, করে দুপুরের নির্জনতায় ও রাতের নিস্তব্ধতায়। প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে শুনি অদ্ভুত ডাকছে তারাঃ 

ঢুপ! ঢুপ! ঢুপ! ঢুঢুপ! 

কফিল মিয়ার সাথে আমরা ছোটরা কোন কথাবার্তা বলি না, সেও আমাদের প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ দেখায় না। পাড়ার ছেলেপুলেরা সংখ্যায় কমে এলেও পূর্ববৎ বৃত্তাকারেই  দাঁড়ায়। তারা যতক্ষণ থাকে কফিল মিয়া মাথানিচু বোবা কালার মতো থাকে। বলতে গেলে এবারে কোড়া নিয়ে আসার পর তার কথাবার্তা কারো সাথেই আগের মতো  নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কোড়াই যেন তার সব,জগতে কোড়ারাই যেন মুল সদস্য।  দাদা মাঝেমধ্যে পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়ার সময় কৌতুহলে তাকান, কিন্তু তার ধ্যান না ভাঙতে সাড়াশব্দ করেন না। বাবা নিয়মিত  ঘুমাতে যাবার আগে আমাদের কাছ থেকে তার রোজকার কোড়াকাণ্ডের ফিরিস্তি নেন।                                       

 কফিল মিয়া রাতে ঘুমায় আমাদের বার কাছারির দূরবর্তী কোণার এক চৌকিতে, দাদার খাট থেকে বেশ ক গজ দূরে। ভৃত্যরা থাকে কাছারির পার্শ্ববর্তী কুঁড়েঘরে।  ঘুমানোর আগে সে ভৃত্যদের সাথে কোড়ার দৈনন্দিন আচরণ সংক্রান্ত দু চার কথা বলে ঘুমিয়ে নাক ডাকা শুরু করে। পারিপার্শ্বিক নিস্তব্ধতায় অনিচ্ছায় হলেও আমরা দূর থেকে কথোপকথন  শুনতে পাই। একসময় আমরাও ঘুমিয়ে পড়ি। একদিন মাঝরাতে আমরা সবাই হকচকিয়ে জেগে উঠি। শুনতে পাই কোড়াপাখিগুলো কাছারিতে প্রবল চেঁচামেচি করছে। কোন পাখির এমন ভয়াল কণ্ঠ আমরা আগে কখনো শুনিনি। হঠাৎ কী হলো পাখিগুলোর?  এমন আর্তচিৎকার ছাড়ছে কেন?গা শিউরাচ্ছে প্রত্যেকের, নিজেরা তা বলাবলি করছি। ভৃত্যরা মৃদুস্বর কথার গোল পাকিয়েছে। দাদা ঘন ঘন চেঁচাচ্ছেন , কফিল, ও কফিল, কী হইলোরে? কী হইলো তোর পক্ষীর? এতো রাত্রে পক্ষী এমন করতেছে ক্যান? কফিল, কথা কইতাছস না ক্যান? পক্ষীগুলারে শিগগির থামা। কানে তালা লাইগা যাইতাছে আমার। কোড়ায় এইভাবে ডাকে জীবনে শুনিনাই। ও কফিল, ওই তরা উইঠা আসস না কেন?

দেখতো কফিলের হইলো কী। ম্যাচটা আবার খুঁইজা পাইতেছি না।  

কফিল মিয়ার   ন্যূনতম আভাস নেই।আকস্মিকভাবে কোড়াদের ডাক ভয়ংকরতম হয়ে উঠতে লাগল। বাবা সম্ভবত চুপচাপ শুনছিলেনএতক্ষণের বিষয়াদি।   এবারে  মুখ খুললেন তিনি, ব্যাপারটা কী?কোড়াগুলা এত ভয়ংকর চেঁচামেচি করতেছে ; এমন তো কোনদিন শুনি নাই, দেখি নাই। কফিলও নীরব, ওরাও ছোট ছোট করে কী বলাবলি করে, একটু উইঠা আসতে কী সমস্যা? কফিল! কফিল!কফিল কি ঘরে নাই নাকি? ব্যাপারটা কি,যাই তো দেখি! 

বাবা দরজায় হাত রাখতেই ওদিক থেকে কেউ বলল, কাক্বা, কফিল ভাই তো নাই-ই ঘরে। কথা কবো কেমনে? ও বাবাগো, কোড়ায় এ্যাবা করে ক্যা? এ  কী পাহি গো?  দাদা, অবস্থা সুবিধার মনে হইতাছে না। চাদ্দর দিয়া কান মাথা ঢাইকা থাকুইন। কাম সারছে আইজ!  কোড়া থুইয়া ভাগছে ব্যাটা কফিলে। ওই তরা ঢুহিস না ঘরে, আইতাছি বাইরে। কাক্কা, দেহুইন ভিতরে যাইয়া। ম্যাচ জ্বালাইয়া দেখলাম আমি। ভয়মকর!গতরের ফইড় বেবাকটির খাড়া,  চোখ খোলা নাই কারুর, খালি চিল্লানি, ভয়মকর!  

আমরা তিন ভাইবোন মা'র সাথে ভয়ে একাকার খোলা দরজায় দাঁড়ানো। বাবা ইতিমধ্যে কাছারিতে উঠে হারিকেন জ্বেলেছেন। এতক্ষণে ভৃত্যরা সব কাছারিতে উঠছে। দাদাও বোধকরি উঠে দাঁড়িয়েছেন। বাইরে  এ বাড়ি ও বাড়ি থেকেও অনেকে কুপি, হারিকেন হাতে জরো হচ্ছে। মুহূর্তে তুমুল হইহট্টগোল লেগে গেলো কাছারি ও গোটা বার আঙিনা জুড়ে। মুখে মুখে একই কথা, কোড়ার আইজ কী  হইছে,  কোড়া রাইখা কফিল মিয়ায় গেছে কই প্রভৃতি । আমার ছোট দাদা যিনি সর্বদাই রহস্যময় কথা  বলতে পছন্দ করেন, ঘন ঘন বলতে লাগলেন,এই ঘটনা স্বাভাবিক না! এ কোড়া অন্য দশটা কোড়া থেইকা ভিন্ন! কফিলেরও নিখোঁজ হওয়া স্বাভাবিক বিষয় না! কিছু একটা না হইলে এমন হইতে পারে না। কিছু দেখছে এরা। অবশ্যি দেখছে! 

তিনি কথা বলার ফাঁকে মাটিতে জোরে লাঠি ঠুকতে লাগলেন। আমার দাদা (বয়সে বড়) রেগে গিয়ে বললেন, তোর যত আকারি চিন্তা আর কথা? কী দেখছে কফিল আর কোড়ায় ? ক কী দেখছে? কস না ক্যান? 

অবশ্যি কিছু দেখছে! মিছামিছি এমন করে না!   

কিন্তু কী সেই বস্তু? ক কী?  

আমার কথা তো তুমি কোনদিনই বিশ্বাস করলা না। 

আহা, ক তুই, তারা কী দেইখা এমন করে। 

তুমি ঘুমের ঘোরে চিরকাল চিক্কুর মারো কী দেইখা? কীয়ে ছায়ার মতন বুকের উপর চাইপ্পা বয়? 

আহা,  খোয়াবের  কথা তর এইখানে জোড়া লাগান লাগব? তুই নিজে কী জানস দেখছস তাই ক।  

আরো বিষয় আছে? তোমার তো কিছুতে বিশ্বাসই নাই। তুমি কী বুঝবা?        

তুই-ই দুনিয়ায় সব বুঝস,  আমার  জন্য আর বাকি রাখছস কী? চিরকাল তর যতো আচাভুয়া বিশ্বাস!  

বাদ দেও অহন, কফিলরে খুঁইজা বাইর করি। এই চাইরদিক বাইর হও সগলে। কাছারিত কেউ ঢুইকো না, খবরদার! দরজায় বাইর শিকল দেও। কফিলরে খুঁইজা না পাওয়া পর্যন্ত কোড়ার ধারে কেউ যাবা না।       

যা, এইবার কাজের কথা বলছস। কফিলরে খুঁইজা বাইর কর শিগগির!       

এই , বাইর হও সকলে। খুঁজো বাড়িবাড়ি । নানান জায়গাতেই খুঁজো।                                                                    

কুপি, হারিকেন, মোমবাতি, টর্চলাইট ধরে এ বাড়ি,ও বাড়ি, গাছপালা, ঝোপঝাড় সর্বত্র তন্নতন্ন করে খুঁজেও কফিল মিয়ার সন্ধান মিলল না। ভোরের আজান নাগাদ বাড়ির চৌহদ্দি জুড়ে নানা কানাঘুষা চলল। ধীরেধীরে আশপাশের লোকজন চলে যেতে থাকে। একসময় আমরা নিশ্চুপ ঘুমিয়ে পড়ি। দিনের আলো ফুটতে অনেকের সমবেত কোলাহলে ঘুম ভাঙে আমাদের। কান পেতে শুনি কারা যেন বলছে কফিল মিয়ার সন্ধান মিলেছে। সে নাকি আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে নদীতীরবর্তী এঁটেল ঢিবির চূড়ায় হাত পা সটানে বিছিয়ে মূর্তিবৎ বসে আছে। কৌতূহলবশত নৌকা নিয়ে কাছাকাছি গিয়ে তারা হাঁকডাক করেছে, কিন্তু সে নির্বাক নিস্পন্দ। তার পোশাক আশাক দিব্যি শুকনো।  খোলা ঘোলাটে চোখ দুটি নাকি তার দিবালোকেও আকাশে অদৃশ্য হতে না পারা ধোঁয়াটে ক্ষীণ চাঁদের দিকে স্থির। এখানে বলে নেয়া ভালো, এঁটেল ঢিবিগুলো উনোয় কুম্ভকারদের তৈরি ও আকারে পিরামিড সদৃশ্য। বর্ষায় কুম্ভকাররা একটা বাদে সবগুলোই কোদালে কেটে নৌকা করে নিয়ে গেছে। যেটিতে কফিল মিয়া স্থির, তার চারদিকে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অথৈ পানি ও পাকখাওয়া স্রোত। কোথাও স্থলভাগ বলতে কিছু নেই।               

বিবরণ শুনে বাবা সমবেতদের নির্দেশ দিলেন দ্রুত নৌকা করে কফিল মিয়াকে  বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে। অনেকে তৎক্ষণাৎ চলে গেল সে উদ্দেশ্যে। আমরা উদ্বিগ্ন অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঘন্টা  খানেকের মধ্যে কফিল মিয়াকে নিয়ে ফিরে এলো তারা। নৌকা থেকে ধরাধরি করে তাকে নামানো হলো আমাদের ভেতর আঙিনার মাঝামাঝি  পাতা বিছানায়। অনেক চেষ্টাতেও তাকে শোয়ানো গেল না।  এঁটেল ঢিবিশীর্ষে বসে থাকার  মতোই বসে রইল সে। ওই ঘন অন্ধকারে সর্বত্র  অথৈ পানি ও প্রবল স্রোতের উজানে অতোটা দূর সে কী করে অভেজা অবস্থায় গেল তা নিয়ে শত প্রশ্নেও তার মুখ খোলানো গেল না। আকাশমুখো বসেই রইল সে মূর্তিবৎ। বারান্দায় চেয়ারে দাঁড়িয়ে আমি আবারো তার চোখের সেই অদ্ভুত  দশাটি দেখে নিভৃতে শিউরালাম।   

এরপর কফিল মিয়া যে কদিন আমাদের বাড়িতে ছিল একটি কথাও কারো সাথে বলেনি। তার কোড়াগুলোও ছিল অহর্নিশ নিশ্চুপ। আমাদের বাড়িতে সে-ই ছিল তার শেষ বেড়ানো । রহস্যটি রহস্যই থেকে গেছে। বন্যা শেষে যেদিন সে আমাদের বাড়ির বাইরে থেকে মেঠোপথ ধরে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে   চলে যায়, তার পিঠে ছিল বোঁচকা বাঁধা, মাথা একান্ত নিচু, পায়ের গতি ধীর, দুহাতে ঝুলছিল ঝিমধরা কোড়াপাখির সেই দুটি খাঁচা।    

1 comment: