Tuesday, September 7, 2021

সংক্রমণ - প্রবোধ কুমার মৃধা

সংক্রমণ
- প্রবোধ কুমার মৃধা

সারারাত ঘুমুতে পারল না বিজয় ।এপাশ-ওপাশ করতে করতে সকাল হয়ে গেল ।অব্যক্ত একটা অস্বস্তি বোধ আর উৎকণ্ঠা মনটাকে অস্থির করে তুলছে ।বড়ো মেয়েটা কাল থেকে বাড়ি ফেরেনি ।প্রতিদিনের মতো সকালে কলেজে বেরিয়ে গেল কিন্তু সন্ধ্যায় আর বাড়ি ফিরল না ।বহু জায়গায় ফোন করে ও কোন খবর পাওয়া যায় নি।বিছানায় বসে বসে কী করবে ভাবছিল বিজয় ।বাড়ির সবাই উঠে প্রতিদিনের মতো ঘোরা ফেরা করছে বটে, মুখে কোন কথা নেই, ওর মা নিঃশব্দে কেঁদেই ‌চলেছে ।
             প্রথম সকালেই বিজয়ের নাম ধরে দাদা দাদা করতে করতে বাড়ির মধ্যে একজন প্রবেশ করল ।বিজয় উঠে তার ডাকে সাড়া দিল; চেনা লোক, পাশের গ্রামে ছোট ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে আসছে ।বসল না,বিজয়কে ডেকে নিয়ে বাইরে গেল।
                       মিনিট পনের পরে বিজয় একা ফিরে এল ।স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে খুব নিচু গলায় সমস্ত ঘটনা খুলে বলল; ‌বড়ো মেয়ে কাবেরী গতকাল সন্ধ্যায় পাশের গ্ৰামে বিশ্বাসদের বাড়িতে উঠেছে এবং সেখানেই আছে ।ধরনী বিশ্বাসের বড়ো ছেলে যে পঞ্চায়েত অফিসের অস্থায়ি কর্মি স্বপন, তার সাথে আজ সন্ধ্যায় বিয়ে ।ধীরে ধীরে বাড়ির অন্যেরা অর্থাৎ কাবেরীর ভাই বোনেরা সমস্ত‌ই শুনল,কেউ  কোন সাড়া করল না।
উৎকণ্ঠা কিছুটা কাটলে ও অস্বস্তি আরো দ্বিগুণ হয়ে চেপে বসল বিজয়ের। হাটে বাজারে তো দূরের কথা, বাড়ির বাইরে যেতে পা উঠছে না তার।পাড়া প্রতিবেশির সামনে মুখ দেখাতে কী যে সংকোচ হচ্ছে তা কাকে বোঝাবে সে।
নিজে নামমাত্র লেখাপড়া করেছে, বংশে বাবা-কাকা-মা-পিসিরা ও তথৈবচ ।ইচ্ছা ছিল ছেলে মেয়েদেরকে শিক্ষিত‌ করবে। মেয়ে দুটো বড়ো, কলেজে পড়ছিল তারা,আশা ছিল অন্তত বি এ পাস করিয়ে তবে বিয়ে দেবে। কিন্তু সব যেন গোলমাল হয়ে গেল ।শান্ত স্বভাবের মেয়েটার মধ্যে এভাবে যে ভাইরাস ঢুকেছিল তার তিলার্ধ আভাস বিজয় পায়নি, বরং বহু জায়গা থেকে তার বিয়ের প্রস্তাব এলে পর পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছে।এমন কি মেয়ের সামনে কোনদিন বিয়ের কথা হতো না।আজ বুঝতে পারছে অষ্টাদশী মেয়ে সম্পর্কে তার মনগড়া ধারণাটি আগাগোড়াই ভুল ছিল।এখন ভাবছে, ছোট মেয়েটি তো কলেজে যায়, সে ও বড়ো হয়েছে। কী জানি তার ও মনে কী আছে! তবে আর নয়, বি এ পাস হোক না হোক,যোগাযোগ করে তাকে এবার বিয়ে দেবে সে।
                      এমন ঘটনা যে এই প্রথম তা নয়।আশেপাশের দু-চার খানা গ্ৰামে দু'একটা অনুরূপ ঘটনা পূর্বে ঘটেছে, এবংঘটছে ,এমনকি এই গ্ৰামে ও ঘটেছে।ব্যাপারটি ধীরে ধীরে সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়ছে  । এতদিন অন্যের ঘটনা কানে শুনেছে, দূরে দূরে সরে থেকেছে, আজ আর এড়িয়ে থাকার কোন পথ নেই। অস্বস্তিটা আরো বেড়েছে এই কারণে যে, ঘটনার উৎসটি একেবারে পাশের গ্ৰামে, ফলে দুই বাড়ির খবরাখবর সকাল বিকাল পাচার হচ্ছে আর নানান গুজব ছড়াচ্ছে; যার অধিকাংশই অতিরঞ্জিত এবং মিথ্যা ।
ভাই বোন দুজন এতদিন যথাসম্ভব নীরবে উদ্ভুত অবস্থাটিকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু উত্তরোত্তর ঘটনার শাখা প্রশাখা ‌ বিস্তার তাদেরকে শেষ পর্যন্ত তিতি বিরক্ত করে তুলল,সমগ্ৰ রাগটাই গিয়ে পড়ল দিদির উপর।আজ এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্য দিদিকেই দায়ি করল তারা।অথচ এসবের কোন প্রয়োজন ছিল না।জানাজানি হলে বাবা মা রাজিই হয়ে যেত।সে সুযোগটিই তাদের দেওয়া হলো না।উল্টে সমস্ত পরিবারের মান মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হলো।উৎসবের আঙ্গিকে যে কাজটি হতে পারত, চরম অপমানের মধ্যে তার পরিণতি ঘটল।শেষ হয়ে গেল না, এর জের যে কতদিন চলতে থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।মুখে বেশি কিছু না বললে ও বিজয়কে পর্যবেক্ষন করলে বোঝা যায় কতটা আঘাত সে অন্তরে অন্তরে সামলে নেওয়ার প্রাণ পণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ।

No comments:

Post a Comment