Tuesday, September 7, 2021

সাজু - কুহেলী দাশগুপ্ত

সাজু

- কুহেলী দাশগুপ্ত


" ও খালা কঁত্তি আইস্যো ? কাম কাইজ কিছু আছেনি? ব্যাক্কে ভালা আছেনি? আঁই আল্লার কাছে দোয় চাই। অাল্লা তোঁয়ারা ব্যাগ্গুনোরে ভালা রাহক।" -একভাবে বলে যায় সাজেদা বিবি ওরফে সাজু। নতুন ধান ওঠার পর চৌধুরী বাড়ির কত্তা মা কুমুদ চৌধুরী গ্রামে এলে সাজুকে খবর দেয়া হয়। সাজু ধান চালের কাজ করে আয় উপার্জন করে। গাঁয়ের বাড়িতে ঘরে ঘরে তার ডাক পড়ে। মুসলমান পাড়ার  বউ সাজু। দোজবরে বিয়ে হয়েছিল। স্বামী তার কসাই। বানার হাটে তার মাংসের  দোকান। আগের পক্ষের বিবি দুটি কন্যা সন্তান রেখে গত হলে, সাজুকে নিকাহ্ করে ওসমান। সাজুর দুই ছেলে আছে। এদের নিয়ে ভরা সংসার তার। লুঙ্গির মতো ঠামি পড়ে সাজু। গায়ে মাথায় অালগা কাপড় জড়িয়ে থাকে।ঠামি হোল বার্মিজ পরিধান। চাপা গায়ের রঙ, খালি পা. হাতে কাঁচের চুড়ি। ছাদে, উঠোনে ধান রোদে দেয়। পা দিয়ে মাড়িয়ে নাড়া চাড়া করে । কূলোয় ঝাড়ে। আর ধামা ভরে নিয়ে যায় চাল কলে।কুমুদ খালার ছটফটে নাতনীটি ভারি ভালোবাসে সাজুকে। রেকাবিতে সাজিয়ে বিস্কিট , চানাচুর দেয়। হাত পেতে নিয়ে পরম সন্তুষ্টিতে বলে,"বাঁচি থাক খালা। দোয়া করির"। মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে। রোদে ঘুরে ধান ঝাড়া ,বাছা করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠে। ঘর্মাক্ত কলেবরে ধূলো মাখা কাপড়ে সে মুখ মোছে। বাড়ি থেকে বয়ে আনা পান্তার পুটুলি খোলে। সাথে খালার দেয়া তরকারি।  পরম তৃপ্তি নিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন সারে সাথে কচ্ কচ্ করে কাঁচালঙ্কা চিবিয়ে। খাওয়া শেষে কানের পাশে গুঁজে রাখা বিড়িতে সুখটান দেয়। ফুক্ ফুক্। মাঝে মাঝে হুঁকো সাজিয়ে ফুরর্, ফুরর্ টানে আর ধোঁয়া ছাড়ে।একটু জিরিয়ে আবার কাজে লেগে পড়ে। ধান ওঠার কালে এইরকম ব্যস্ত সময় কেটে যায় । দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। কুমুদ খালা চা বিস্কিট দিলে, পরম তৃপ্তি নিয়ে খায়। কত কথা তার!তাড়ি খেয়ে মরদ তার চ্যালা কাঠ দিয়ে মেরে পিঠে দাগ করে দিছে। বলতে গিয়ে চোখ জলে ভরে তার। "কিরতাম খালা? কাম করি দুখান পয়সা পাই। হেতায় ব্যাবাক নিতি চায়। ন দিতাম চাইলে অ্যান করি পিডায় দে"। সাজুর কথা শুনে খালাম্মার ও মন খারাপ হয়। "পোলা দু য়া রে ইস্কুল দিসি। আঁই পড়া লেখা ন জানি। ইতারা পড়খ।" মরদের মার খেয়ে পিঠে কালসিটে পড়ে গেছে দেখায় সাজু। কথায় কথায় কখন সন্ধ্যে নেমে আসে। ঠাকুর দালানে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে, শাঁখ বেজে ওঠে। দিনের রোজগার সম্বলটুকু কাপড়ের আচঁলে বেঁধে সে বাড়ির পথে এগোয়। ধূলো মলিন খালি পায়ে মেঠো রাস্তা, আল পথ ধরে চলতে চলতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় দৃষ্টি সীমার বাইরে। 
     অনেক কাল বাদে চৌধুরী বাড়ির নাতনী রমা গাঁয়ে এসে সাজু খালার খোঁজ করে। বেঁচে নেই তখন সাজেদা। রমার কত কি মনে পড়ে! একবার বিজয়াতে বড়দের সকলের সাথে সাজুকে প্রণাম করেছিল ছোট্ট রমা। জিভ কামড়ে সাজু খালার কি লজ্জা!যেন কোন গর্হিত কাজ হয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়ে প্রাণভরে দোয়া করত।  একদিন রমার হাত ধরে বলেছিল,"ও খালা, তর বাপেরে কইস টেঁয়া দিতে, পিন্ধনের কওড় ছিড়ি গিয়ে।" রমার বাবা তার কথা রেখেছিলেন। ধামা ভরা ধান নিয়ে চাল কলে  যাওয়ার মানুষটি চিরতরে হারিয়ে গেছে। মাজা গায়ের রঙ, ক্লান্ত মায়া ভরা চোখদুটি আর ব্যাথা ভরা হৃদয়ের কষ্ট লুকিয়ে অমলিন হাসি মুখখানি মনে পড়ে বার বার, রমার ফেলে আসা শৈশবের স্নেহ মাখা ডাক আর মেঠো গায়ের গন্ধ।

No comments:

Post a Comment