Tuesday, September 7, 2021

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (৪র্থ পর্ব) - অতনু দাশ গুপ্ত

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (৪র্থ পর্ব)

- অতনু দাশ গুপ্ত


কোরির এসব প্রশ্ন করার ধরণ দেখে মনে হচ্ছিল  স্বাভাবিক বিষয়ে কথা বলতে কতটা পারঙ্গম সেটা বোঝার চেষ্টা করেছিল ও।
 গ্রাহকদের সাথে শুধু বৈষয়িক বিষয়ে কথা বললেই হলো না, অন্যান্য বিষয়েও সতস্ফুর্তভাবে কথা বলতে পারতে হবে। 
বেশ নিঃসংকোচে বলে ফেললাম, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বেসরকারি সংস্থা - ব্র্যাক, বাংলাদেশের। যার প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ। 
সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত -কক্সবাজার, আমার শহর চট্টগ্রামে এবং দীর্ঘতম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন আমাদের দেশে। (ভারতের সাথে সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের)।  এগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। ওকে দেশে আসার আমন্ত্রণ জানালাম।
তখন ও জানালো, ভারতের পাঞ্জাবে বেড়াতে গিয়েছিল। ওখানকার খাবার দাবার খুব পছন্দ। যদিও ক্যানাডিয়ানরা মষলাযুক্ত খাবারের ধারেকাছেও ঘেঁষে না! এক্ষেত্রে কোরির খাদ্যাভ্যাস ব্যতিক্রমধর্মীই বলতে হবে।  

যাতায়াতের ক্ষেত্রে নর্থ সিডনির দূরত্ব অনেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যারা সিডনি থেকে যাতায়াত করবে, তাদের ক্ষেত্রে। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এক্ষেত্রে আমার কোন আপত্তি আছে কি না। এ ব্যাপারে অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম, চাকরির সুবাদে দুর্লঙ্ঘ পথ হলে সেটাও পাড়ি দেব। আসা যাওয়াতেই দু'ঘন্টার পথ! আর গাড়িতে সেটা চল্লিশ - পঞ্চাশ মিনিট। 

শেষে অভ্যাসবশত জিজ্ঞেস করলো, আমার কোন প্রশ্ন আছে কি না? এটা সব ইন্টারভিউয়ের ক্ষেত্রেই ছিল। প্রথমে না বুঝলেও পরে বুঝেছিলাম, এ প্রশ্নের মাধ্যমেও আপনি চাইলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর মনে নিজের সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা এনে দিতে পারেন। আমরা পরবর্তীতে দেখতে পাবো। 

সাক্ষাৎকারপর্ব শেষ হলে বাইরে এসে ওয়ালমার্টের ভেতরে  চারিদিকে একটু ঘুরে দেখলাম। বেশ উৎফুল্ল লাগছিল। কয়েকটা ব্যাপার লক্ষ করার মতো - 

সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটলো বাসায় ফেরার পর। এসে পৌঁছলাম ৩.৩০ বা ৪টা নাগাদ। ল্যাপটপ নিয়ে বসে ইমেইলে উকি দিতেই দেখি, "অভিনন্দন অতনু। তোমাকে ওয়ালমার্ট পরিবারে স্বাগতম!!" তবে ওখানে শর্ত হিসেবে এটাও ছিল - আমার আরও কিছু কাজ করতে হবে। কানাডা পোস্টে নিজের ছবি যুক্ত সরকারি পরিচয়পত্র,পাসপোর্ট এবং স্টাডি পারমিট  কপি জমা দিতে হবে। এসব যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। বেশ উৎকন্ঠার মাঝেও সব কাজ স্রষ্টার অশেষ আশীষে  নির্দ্ধিধায় করতে পেরেছিলাম।  দিন সাতের মধ্যে যোগদানের তারিখ নিশ্চিত করে আরেকটা ইমেইল আসলো। বুঝলাম, শেষ হলো ছয় মাসের অপেক্ষার অবসান। 

কথায় বলে, সুখের দিন অস্থায়ী! এরপর চাকরি থাকলেও অনেক ঘটনায় জীবন জর্জরিত হয়ে পড়লো। পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক, শিক্ষাগত টানা সমস্যার টানাপোড়েনে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। কথা দিচ্ছি, এসবের কথা নিয়েও অন্য কোন সময় কথার ঝাঁপি খুলে বসবো! 

ওয়ালমার্টের জবে পরিশ্রম হচ্ছিল প্রচুর কিন্তু সে অনুপাতে টাকাও কম আর সময় সাপেক্ষও। নিরুপায় হয়ে কাজ করে গিয়েছিলাম দিনের পর দিন। এদিকে ইউনিভার্সিটির পাহাড়সম খরচ মেটাতে অবশ্যই আমার আরও জবের প্রয়োজন ছিল এক কথায় অবশ্যম্ভাবী।  অথই সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগলাম রীতিমতো। কিন্তু ঈশ্বরে অসীম বিশ্বাস রাখলে তিনি কখনোই কাউকে ফেরান না। আমার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল।  অবস্থা বেগতিক দেখে সহপাঠীনি এগিয়ে এল। জানালো ডিনের সাথে দেখা করার কথা। আরও বললো আমরা কিছু বিষয় আগে পড়ার সুবাদে ক্রেডিট পেতে পারি। তাহলে বেশ বড় খরচ বেঁচে যাবে। ওর পরামর্শ মতো পরের দিনই ডিনের সাথে দেখা করে নিজের দুরবস্থার কথা জানালাম। তবে এটাও ঠিক, হেলেন - আমাদের ডিন, প্রথম থেকেই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। নিয়মিত ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষেত্রে যা হয়! সবকিছু শুনে হেলেন যা  জানালো তাতে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম! আমাকে ওর এ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে আপাতত কাজ শুরু করতে বললো। কাজ মূলত ল্যাবের পরীক্ষার খাতা সংশোধনী করা। এক্ষেত্রে এ চাকরি পাওয়াটা ভালো ছাত্র এবং ব্যাক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে সম্ভব হয়েছিল।  তবে সহপাঠীনি আর্শদ্বীপ আমার জন্য আর্শীবাদ বয়ে এনেছিল নিঃসন্দেহে! ইন্টারভিউ নেওয়ার রীতি থাকলেও হেলেন নিজ উদ্যোগেই সেটা তো নেয়নি বরং উল্টো অফিস থেকে আমার জন্য সব প্রয়োজনীয় চুক্তির কাগজপত্রও জোগাড় করে আমার সই নিয়ে ঠিক করে রেখেছিল যাতে আমি ঠিক সময়ে বেতন পাই আর পড়ার খরচ দিতে পারি! সত্যিই অসাধারণ! এমন সুসম্পর্ক আসলেই ঐশ্বরিক ব্যাপার! তা এখনও বজায় আছে।  

দুটো চাকরির সুবাদে আপাতত বেসামাল পথ পাড়ি দেওয়াটা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলো। পরের বছর থেকে খরচ গেল বেড়ে!  প্রতিবছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পড়ার খরচ বাড়ায়। এটা একরকম রীতিতে দাঁড়িয়ে গেছে। যতই আমরা বলি না কেন আমরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে বিদেশে যাই।  কিন্তু এর আসল রূপ খুবই কদাকার। শিক্ষার বদলে মূল উদ্দেশ্য অর্থ বা পূঁজি উপার্জন! অপ্রিয় সত্যি কথা অকপটে বলতে আপত্তি দেখছি না। কথাটা কেন বললাম সেটা আগামী পর্বেই আমরা দেখবো। 

আমি ইউনিভার্সিটির ভেতরে আরও কয়েকটা পদের জন্য আবেদন করেছিলাম। সবসময়ই লক্ষ ছিল ক্যাম্পাসের ভেতরের কোন কাজ করতে পারা। সাক্ষাৎকারের ডাক পেলাম ক্রীড়া বিভাগের সহকারী ম্যানেজারের পদে। কেপ ব্রেটন ইউনিভার্সিটির চাকরি সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো ইমেইলেই হয়ে থাকে।
 ক্রীড়া বিভাগের ম্যানেজার শন রনির ইমেইলে উল্লেখ করা ছিল - পঁচিশ সেপ্টেম্বর বেলা ১- ২.৩০ টার মধ্যে আমি যেন ওর অফিসে উপস্থিত হই। সময়কাল পনের মিনিটের বেশি না।
যথাসময়ে ক্লাসের অবসরে হাজির হলাম সালিভান ফিল্ডহাউজের দ্বিতীয় তলায় কক্ষ নাম্বার এ.সি -২১৮ তে। 

আমার আগেই সহপাঠীনি সিলভার ইন্টারভিউ ছিল। লাইব্রেরিতে যখন শেষ মূহুর্তের ইন্টারভিউর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন সিলভা আগাম শুভকামনা জানিয়ে চলে গেল।  ধীরে ধীরে আমিও বুক স্টোরের পাশ ঘেঁষে যে করিডোর সোজা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের দিকে চলে গেছে ওদিকটায় গিয়ে সালিভান ফিল্ড হাউজের দ্বিতীয় তলায় যখন পৌঁছাই, তখন ঘড়িতে ২.২৪। ইউনিভার্সিটিতে দ্বিতীয় সাক্ষাৎকার। 
দরজায় টোকা দিলে ভেতর থেকে আওয়াজ এলো,"কামন ইন"

কালো রঙের স্যুট পরিহিত ব্যাক্তিই শন রনি। আমার সাথে করমর্দন করে বসতে বললেন।  
অন্যান্য প্রাথমিক প্রশ্নের পর্ব শেষে ওই পদের  মূল প্রশ্নে চলে গেলেন 
কেন এই পদে আবেদন করেছি? কি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে?  
- খেলাধুলার সাথে ছোটকাল থেকেই জড়িত। এখানে আসার পর এখানকার খেলার পরিবেশ, নতুন খেলার ধরণের সাথে পরিচিতি আর ইউনিভার্সিটির হয়ে কিছু করতে পারা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  আমি মনে করি, এই পদ আমাকে একদিকে যেমন নতুন ছাত্র ছাত্রীদের সাথে কাজ করার সুযোগ করে দেবে,তেমনি অনেক নতুন খেলার ধরণ যা এতদিন কেউ দেখেনি,  সেগুলোকে সবার সাথে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার কাজও হবে। 

এমন কিছু খেলার উদাহরণ দিতে পারো? 

- নিঃসন্দেহে - ক্যারাম, লুডো, পিকল বল এবং বোলিং। 
এক্ষেত্রে বোলিংয়ের জন্য  আমরা ফিল্ড হাউজে আলাদা একটা জায়গা বরাদ্দ করতে পারি। খুব জনপ্রিয় এই খেলার কথা বন্ধুরা প্রায়ই বলে থাকে। কাজেই বোলিংয়ের সংযোজন অনেক বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে আমাদের ক্রীড়া বিভাগে। 
 পিকল বল আমরা যেখানে ব্যাডমিন্টন খেলছি, সেখানেই হতে পারে। ক্যারামের জন্য  আমাদের পিট যেখানে টেবিল টেনিস খেলা হয়, সেখানে ব্যবস্হা করা যেতে পারে। আর লুডোর আয়োজন খুব সহজ, দাবা খেলার মতই একটা বোর্ড আর গুটির প্রয়োজন হয়। 

আর বর্তমানে যেভাবে কাজ হচ্ছে,  তার তদারকি কিভাবে করবে কোন ধারণা আছে? 

- হ্যাঁ, মূলত ছেলেমেয়েরা তাদের কার্ড জমা রেখে ভেতরে খেলতে যায়। বাইরের মানুষজনও আসে, সেক্ষেত্রে ওদের কাছে থেকে ফি নিতে হয়। কার্ড ছাড়া ভেতরে প্রবেশ নিষেধ।  ওদের খেলাধুলার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জোগান দেওয়া এবং দেখভাল করার দায়িত্বও আমার  উপর বর্তায়। 

খেলায় কেউ আহত হলে কি করবে? তৎক্ষণাৎ কি ব্যবস্হা তোমাকে নিতে হবে?

-আমি সিপিআর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। কাজেই কেউ আহত হলে কি করা প্রয়োজন এর সম্পর্কে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার  ধারণা আছে। অবশ্যই জরুরি সেবায় ৯১১ এ ফোন করতে হবে যেন সঠিক সময়ে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পাঠানো যায়। প্যারামেডিক টিম আসার আগ পর্যন্ত চিকিৎসার সব ব্যবস্হা  নিশ্চিত করবো। 

এরপর আরও কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন যেমন - আমার প্রিয় খেলা, খেলোয়াড় বা দেশে কোন কোন খেলা জনপ্রিয় জিজ্ঞেস করা হয়েছিল।  

সব কিছু দেখে তখন পর্যন্ত  শন রনিকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি হতে পারে তা ঠাহর করতে পারলাম না! ও জানিয়ে দিল আগামী সপ্তাহের মধ্যে ফলাফল ইমেইল করে জানিয়ে দেবে। 

No comments:

Post a Comment