Tuesday, September 21, 2021

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (৫ম পর্ব) - অতনু দাশ গুপ্ত

কানাডার চাকরি বৃত্তান্ত (৫ম পর্ব)

- অতনু দাশ গুপ্ত


ইন্টারভিউ ভালো হলেও জানতাম আমার চেয়ে আরও যোগ্য  কোন প্রার্থী সিলেকশন হয়ে গেলে আর কিছুই করার থাকবে না। বাকি পদগুলোর জন্যও আবেদন করে গেলাম আপাত পরীক্ষা দেওয়া ম্যানেজার পদের জন্য কোন আশা না করে। আরও একটা কারণ ছিল - ইন ক্যাম্পাস বা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের ভেতরের চাকরির একটা পদের বিপরীতে এপলিকান্ট হতো অনেক। কাজেই প্রতিযোগিতাও হতো হাড্ডাহাড্ডি! 

আর ওদিকে ওয়ালমার্টের চাকরি নিয়ে সমস্যা পিছু ছাড়ছিল না। আমার ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজার গেল পালটে। নতুন  ব্যাক্তি হল কার্ট আর সে আসার পর থেকেই কাজের মজুরি কমে যেতে লাগলো। মজুরি মানে হলো এখানে ঘন্টার হিসেবে পে করা হয়। যার জন্য  যত ঘন্টা ম্যানেজার বরাদ্দ করবেন, তার বেতনও তত বেশি। বুঝতে পারলাম না  কার্টের মতিগতি!  
আবার আমাদের পরে আরও নতুন ছেলেমেয়েদের ওরা চাকরিতে নিল। এটা ওয়ালমার্টের অনেক পুরনো রীতি যা চূড়ান্তভাবে অগ্রহণযোগ্য। যারা কাজে আছে, ওদের পুরোপুরি টাকার বন্দোবস্ত না করে নতুন চাকরি প্রত্যাশীদের জবের ব্যবস্হা করে দেওয়া। একদিক থেকে সরকারকে দেখানো যে নতুন মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে কিন্তু অন্যদিকে পুরনো যারা রয়েছে তাদের পেটে লাথি মেরেই এটা করা হত! জানি, লাইনটা পড়তে যত খটমটে, মনে রাখবেন বাস্তবতা তার চেয়েও তিক্ত। বর্তমানে প্রায় ৯০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থানের উপায় করে দেওয়া বিশাল এ প্রতিষ্ঠানের ৩৪৩টি স্টোর (কানাডায়)  রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডার নুনাভুট ব্যতীত সব প্রদেশে। ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ওয়ালটনের নাম অনুসারে না হলেও ওনার নামের অনুকরণেই ওয়ালমার্টের নামকরণ করা হয়েছে। একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ব্যাক্তির তকমা পেয়েছিলেন। তাঁর আদর্শ ছিল - "যদি আপনি কোন সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান, তাহলে কর্মীরা যেন মনে করে আপনি তাদের জন্য কাজ করছেন, তারা আপনার হয়ে নয়!"
  
তবে কাজ করতে এখন যা দেখছি মনে হয় না কেউ ওনার আদর্শের ছিটেফোঁটাও বিশ্বাস করে! এখন এটাও বুঝতে পারছি না যখন আমরা জয়েন করেছিলাম,তখনও কি এভাবেই অন্যদের ঠকিয়ে আমাদের টাকার  ব্যবস্হা করা হয়েছিল কি না! যা ই হোক, পরিস্থিতি দিনের পর দিন খারাপ হতে লাগলো, শেষমেষ আমি নিজে কার্টের সাথে দেখা করলাম। সবকিছু খুলে বলার পর ও আমাকে বর্তমানের পদ পরিবর্তন করে নতুন আরেকটা পদে আবেদন করতে বললো। গ্রিটার পজিশন - ওয়ালমার্টের প্রবেশপথে যারা দাঁড়িয়ে থেকে গ্রাহকদের স্বাগতম জানায় আর বিদায় দেওয়ার সময় রসিদ চেয়ে জিনিসপত্র যাচাই-বাছাই করে। তখন স্টোরের একজন অভ্যর্থনাকারী ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল কারণ যে এই পদে ছিল সে কথা বার্তা ছাড়াই ভেগেছে। কথা শুনে যা বুঝলাম, কারণটা ওদের স্বার্থের সাথে জড়িত আর যেহেতু বর্তমানে সে পদে কেউ নেই, ওর জন্য বরাদ্দকৃত মজুরিও বাকিদের মধ্যে বন্টন করে দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে আমার অনুরোধ কার্টকে এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ করে দিল - খালি পদের জন্য লোকও পাওয়া যাবে আর আমি ওর কাছে মজুরি বাড়ানো বা ঘন্টার বেশি পাওয়ার অনুরোধ করেছিলাম,  সেটার সমাধানও হয়ে যাবে! কিন্তু আমার গ্রিটার পজিশনে এপ্লাই বা কাজ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে বা আগ্রহ ছিল না। মাঝেমধ্যেই তখন আমাকে ওই পজিশনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বলতে গেলে!! ওই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে অনেক ধরনের চিন্তার আড়ালে হারিয়ে যেতাম। ভাবতাম, কিভাবে একজন মানুষ আট ঘন্টা এভাবে দাঁড়িয়ে সময় কাটাতে পারে? তবে হরেক রকমের মানুষকে দেখা, তাদের হাবভাব সম্পর্কে বিভিন্ন কল্পনার জগতে বিচরণ করা। কিছু মানুষের মুখ চেনা হয়ে গিয়েছিল - জানতাম এ চুরির উদ্দেশ্য এসেছে, বা কেউ আসলেই অনেক ভালো, নিজে থেকে কথা বলতেন, আমার সম্পর্কে জানতে চাইতেন। চোর সন্দেহ হলে সাথে সাথে ম্যানেজারকে খবর দিতে হতো। সেক্ষেত্রে আমি অন্য এসোসিয়েটদের জানিয়ে দিতাম। ওরা ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে কল করে দিত। সমস্যাটা আসলে মূর্তির মত ওখানে দাড়িয়ে থাকার চাইতেও কাজ না করায়।  প্রকৃতিগতভাবে আমি নিশ্চল স্বভাবের নই মোটেও, সবসময় কাজের মধ্যেই থাকতে পছন্দ করি। কিছু না কিছুতে ব্যস্ত থাকাতেই আনন্দ খুঁজে ফিরি। সেই আমাকেই কি না দেওয়া হলো রীতিমতো বিপরীতে মেরুর কাজ। না, সম্ভব নয়। চেষ্টা করতে লাগলাম, কিভাবে কার্টের পাতা ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা যায়? 

প্রথমে তো ওকে হ্যাঁ ও বলে ফেলি, পরবর্তীতে আবার জানাই, সম্ভব হবে না আমার পক্ষে।  তখন কার্ট বেশ অসন্তুষ্ট হয় আর প্রতিউত্তরে জানায়, ও নিজেও বুঝতে পারছে না কি করবে আমার ব্যাপারে। আপাতত ওয়ালমার্টে সবকিছু মিলিয়ে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়লাম। তবে ইউনিভার্সিটির চাকরির সুবাদে খরচের ঝামেলা পার পেয়ে যেতে লাগলাম।  ক্লাস, পরীক্ষা, পড়াশোনা, দুটো চাকরি, সাথে রান্নাবান্না, বাজার করা আর বাসার নিত্যনৈমত্তিক অশান্তি এভাবেই কেটে যেতে লাগলো। হয়তো ঈশ্বরের কৃপা হয়েছিল।  এ সময় আর্শীবাদ হয়ে পাশে দাঁড়ালো ওয়ালমার্টের স্টোর ম্যানেজার জেনিফার। তবে অনেকটা আড়াল থেকেই। আমার ডিপার্টমেন্ট পালটে পোশাক-পরিচ্ছদে দেওয়া হলো। এটা বরাবরই আমার প্রিয় কাজের জায়গা ছিল। বাসায়ও আমি জামা কাপড় গোছানোর কাজ করতাম। মূলত মায়ের কাছেই এটা শেখা। প্রতিদিনের নিয়মিত কাজের কারণে ওই ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার স্যান্ড্রার সুনজরে পড়লাম। এভাবে টানা মাস তিনেক চললো। 
ও আমার সুপারভাইজার ট্রেসিকে জানিয়েছিল ব্যাপারটা। ফলস্বরূপ ওইবারের সেরা কর্মকর্তার পদক দেওয়া হয়েছিল। সকালে মিটিংয়ে সবাই একসাথে দাঁড়াবে, ম্যানেজার সবাইকে বিভিন্ন লাভ-লোকসানের হিসাবের পাশাপাশি মাসের সেরা ব্যক্তির হাতে তুলে দেবেন পদক। যখন আমাকে দেওয়া হলো, সবাই করতালি দিয়ে উষ্ণ অভিবাদনে সিক্ত করলো আমাকে। 

একপ্রকার সম্পূর্ণ ভগ্ন দশা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম করুণাময়ের অপার কৃপায়। তবে চাকরির জন্য ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন বিভাগে আবেদন থামিয়ে রাখিনি কখনো, ওটা ভেতরে ভেতরে করে যেতে থাকলাম। এক্ষেত্রে ড্যানিয়েলের কথা বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন যা এতক্ষণ বলিনি। প্রথমে যখন চাকরি খোঁজা শুরু করি,  তখন আমার স্টাডি পারমিটে সমস্যা ছিল, তাই ওটা সংশোধনের জন্য পাঠাই। এতে ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল অফিসের উপদেষ্টা ড্যানিয়েলের বিশেষ ভূমিকা ছিল। সেই ঘটনার সূত্র ধরে প্রথমদিন থেকেই পরিচিত হওয়া ড্যানিয়েলের সাথে সবসময়ই যোগাযোগ ছিল। আমাকে সবসময়ই বিভিন্ন পদে আবেদনের জন্য অনুপ্রেরণা দিত আর ইমিগ্রেশনের খুটিনাটি সব ব্যাপারে কথা হতো। 

এরপর লাইব্রেরীর সহকারীর পদের জন্য ইন্টারভিউয়ের  ইমেইল পেলাম। কোন পদের জন্য সাড়া পেলে কাউকে না জানালেও শুধু ড্যানিয়েলকে অবশ্যই জানাতাম। অবশ্য সবসময় এমনও হতো না যে সব পদের খবর ও জানাচ্ছে আমাকে কিন্তু মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটাও অনেক। এ তল্লাটে বিনা প্রয়োজনে কেউ কারও খবর রাখে না, আর মনে করিয়ে দেওয়াটার তো প্রশ্নই আসে না! তবে লাইব্রেরীর পদের বিবরণীতে এমন কিছু পূর্বশর্ত দেওয়া ছিল যেগুলো এই অধমের  আয়ত্তের বাইরে। সেক্ষেত্রে যারা এগুলো জানে বা ধারণা রাখে বা আগে কাজ করেছে তারা ইন্টারভিউ দেওয়ার আগেই আমার থেকে এগিয়ে গেল অলিখিতভাবে। হুবহু একই ব্যাপারে ধারণা না থাকলেও ঠিক করে রেখেছিলাম ওই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে উত্তরে কি বলবো যা ওদের মনপুত হবে। হয়তো পুরোপুরি হবে না, তবে সে চেষ্টা করতে হবে। কিছু নিদিষ্ট সফটওয়্যারের কথা বলা হয়েছিল যেগুলোর নামও কখনো শুনিনি। কাজেই সাক্ষাৎকারের আগেই মানসিকভাবে পিছিয়ে ছিলাম এমনটা বলা যায়।  

তারপরও কোন সমস্যা হতো না যদি কৃষ্ণকন্যার ফাঁদে না পড়তাম! নির্ধারিত সময়ে লাইব্রেরীতে উপস্থিত হয়ে মুখোমুখি হলাম তিনজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর। এতগুলো ইন্টারভিউ দিলেও তিনজনের মুখোমুখি আজ পর্যন্ত হইনি। এনাদের মধ্যেই ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রমী এক আফ্রিকান মেয়ে যার আপাতত নাম দিলাম কৃষ্ণকন্যা !! 

No comments:

Post a Comment