Tuesday, September 21, 2021

ধবল পথ (পর্ব ১) - শওকত নূর

ধবল পথ (পর্ব ১)

- শওকত নূর


পৃথিবীটা এভাবেই ধরা দিত আমার কাছে। বোধের উন্মেষ ঘটলেও বুঝতে পারতাম না আমি কে -কী, দেখতে কেমন, কী আমার পারিপার্শ্বিক  বিষয়াদির বৃত্তান্ত কিংবা তাৎপর্য। যে 'পৃথিবী' শব্দ দিয়ে এ কাহিনি শুরু  হলো সেই পৃথিবীটা কী, দেখতে কেমন, তা-ও ছিল বোধের একান্ত বাইরে। কেউ দয়া করে এর কোন বর্ণনাও তুলে ধরত না আমার কাছে। আমার হৃদয় তথা অস্তিত্ব জুড়ে প্রভাব বিস্তার করে থাকত শুধুই শব্দ, শব্দপাত - বিচিত্র যত শব্দপাত। চারপাশে কত না হাজার শব্দপাত! যে জায়গাটিতে আমাকে নিত্য  বসিয়ে দেয়া হত সেখানকার কথাই বলি। সেটি নগরের ফুটপাত। মানুষের পায়ের শব্দ, বিচিত্র কথোপকথন, হাঁকডাক, গালমন্দ,  গান - গজল, বাঁশি -মাইক্রোফোন, হকারের পণ্য বিক্রির দৃষ্টিআকর্ষণ, অল্প বিস্তর পাখির গান, যানবাহনের ইন্জিনের গর্জন, হর্নের শব্দ, যাত্রীর কোলাহল, অন্তত বার দুই আযানের ধ্বনি - সব ছাড়িয়ে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত কল্পনায় দিব্যি যে শব্দটি আমার বুকে মৃদু বা জোরালো স্পন্দন ওঠাত তা হচ্ছে সামনের থালায় মুদ্রাপতনের শব্দ। কাগুজে টাকাও বেশ জমা হত থালায়, তবে  বেশিরভাগ তা নিঃশব্দে পতিত হওয়ায় তার প্রভাব থাকত না আমার ওপর। মুদ্রা পতনের শব্দের অপেক্ষায় যেমন কান পেতে থাকতাম, তেমনি স্পন্দিত হতাম শব্দটি কানে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। এ বয়সে জীবন বলতে আমার কাছে যা ফুটে উঠেছে, তার সার্থকতা যেন ওই মুদ্রার শব্দেই নিহিত। মানুষের এত যে কথা, এত যে বহুলবিচিত্র বাক্যালাপ তার বিন্দুমাত্রও অর্থবহতায় আসত না আমার কাছে। শুধুই গভীর আগ্রহে  কান পেতে থাকতাম কখন থালায় মুদ্রাপতনের ধ্বনিটি শুনবো, সেই প্রতীক্ষায়। 

একদিন হঠাৎ প্রথমবারের মতো আমাকে স্পন্দিত করল একটি মনুষ্যকথন, এত সুন্দর বাচ্চাটাকে পথে বসিয়ে ভিক্ষা করায় কে? বিবেকে বাঁধে না? 

অন্ধ! অন্ধ! ভিন্ন একটি কণ্ঠ কানে বাজলো। 

অন্ধ তো কী হয়েছে? দেখতে কত সুন্দর! একে দিয়ে ভিক্ষা না করালে হত না? 

আহা, ও তো চোখেই দেখে না। ওর আবার সুন্দর অসুন্দর কী? ও কি বোঝে সুন্দর কী? এই যে সুন্দর পৃথিবী, ও কি বোঝে তা কেমন? 

আহা, ওকে বোঝালে ঠিকই ও মনের চোখ দিয়ে তা বুঝতে পারত। 

বাদ দাও, অন্ধের আবার মনের চোখ! চেহারা সুন্দর হলেও গরিবের ঘরে অন্ধ হয়ে জন্মেছে, তাই ভিক্ষাই ওর একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান। থালাতে পয়সার শব্দ শোনাই ওর কাছে সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। 

এভাবে বলো না। চলো ছেলেটার কাছে যাই। ওকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করি। 

আমি কান ফেলে শুনলাম, শব্দ করে কারা আমার কাছাকাছি এলেন। হয়তো তারা আমার সামনাসামনি বসলেন কিংবা উবু হয়ে প্রথমে আমার থালায় ধাতব মুদ্রা ফেললেন। তারপর খানিকটা উঁচু গলায় বললেন, এই যে এখানে বসে আছো, কে বসিয়েছে এখানে? 

আমার সৎবোন। বললাম আমি। 

মা বাবা নেই তোমার? 

না। 

কোথায় থাকো? 

জানি না। জায়গাটার কী যেন নাম। 

তুমি কি জানো তুমি দেখতে কেমন? 

না। 

পৃথিবী সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে পারো? অনেক সুন্দর যে পৃথিবী, তা? 

না। 

তোমার থালায় টাকা ফেলেছি, শব্দ শুনেছ? 

হ্যাঁ। 

শুনতে কেমন লেগেছে? 

ভালো। 

ফপ্ ফপ্ ফর -র- র -র - -ফপ্! এ শব্দটা কেমন লাগল? আগের চেয়ে ভালো? আগন্তুক মুখ দিয়ে শব্দ করলেন। 

না।  

পি-ই-পি পি পি - পিপু পিপি পিপি, পি -ই পিপি- ই---

পি পি পিপু পিপু, পু -উ- পুপু উ----! এ শব্দটা? কাঁধের বাদ্যযন্ত্র বাজালেন আগন্তুক। 

ভালো। হেসে বললাম আমি। 

কোনটি বেশি ভালো, থালায় টাকা পড়ার শব্দ, নাকি এটি? 

এটি। 

কিছু কি বুঝতে বা দেখতে পাও? কোন পরিবর্তন কি হলো চোখের সামনে?  আগন্তুক চোখের সামনে একটি কাগুজে টাকা ধরে বললেন। 

না। 

এবার? একটু মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করো তো। চোখের সামনে কি কোন পরিবর্তন হলো?  আগন্তুক চোখের সামনে শক্তিশালী  টর্চলাইট ধরে বললেন। 

উহু। 

এই যে তিনটি অবস্থা - মুদ্রার শব্দ, পি পি বা বাদ্যযন্ত্র, সামনে কাগুজে নোট ধরে থাকা -এ তিনের মধ্যে কোনটি তবে বেশি ভালো লাগল? 

পিপি! 

তাহলে তিনটির মধ্যে পিপি হচ্ছে সুন্দর বা বেশি সুন্দর। 

সুন্দর কী? 

সুন্দর হচ্ছে তা-ই যা দেখতে ভালো। 

আমি তো দেখি না!  

হ্যাঁ, শুনে কিংবা মন দিয়ে বুঝে যা কিছু তোমার  ভালো লাগবে, তা -ই  তোমার জন্যে সুন্দর। সব মানুষেরই সুন্দর থাকে। আচ্ছা ধরো, তোমাকে যদি দুটি কাজের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়? 

কী কাজ? 

এই ধরো, এখানে বসে থালায় মুদ্রার শব্দ শোনা আর বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বা পিপি  শোনা - কোনটি বেছে নেবে তুমি? 

পিপি! 

তার মানে তুমি এখন বুঝতে শিখছো ভালো বা সুন্দর কী। এই পৃথিবী, যেখানে আমরা থাকি, তা অনেক সুন্দর, পিপির মতো সুন্দর। ধীরে ধীরে এ সুন্দর পৃথিবীকে তুমি দেখতে ও বুঝতে শিখবে, কি চাও কি না  তা? 

চাই!   

তাহলে  আজ থেকে মনে মনে শুধু আওড়াতে শেখো - সুন্দর মানে ভালো, ভালো লাগা। যেমন - থালায় মুদ্রার শব্দের চেয়ে বাদ্যযন্ত্রের শব্দটি ভালো বা সুন্দর। মনের ভেতরে শুনতে থাকবে এ শব্দটি, কেমন? 

জি। 

তাহলে মনে মনে শোনো একটু এখনই, শুনতে পাচ্ছো? 

জি। 

সুর মনে রেখে বারবার  শুনবে শব্দটি। চাইলে মুখ দিয়েও করতে পারো। একটু করো শুনি। 

পি -ই পি -পি -পিপ্! 

ব্যস!  আরেকটু শুনে নাও। আমি যেতে যেতে বাজাবো, তুমি শুনতে থাকবে - তারপর মনে রেখে একা একা মুখে বাজাবে, কেমন? 

জি। 

তারপর আমি কান পেতে পিপি শব্দটি শুনতে থাকি। আগন্তুক বাজিয়ে চলে যান। ধীরে ধীরে বাইরে অশ্রুত হয়ে আসে শব্দ। এরপর তা আমার মনের ভেতরে থাকে। আমি তা মনে ধরে রেখে মনে মনেই বাজাতে থাকি। কিছুক্ষণ পর বাজনা থামিয়ে ভাবতে থাকি। এত কথা হলো আগন্তুকের সাথে, অথচ ভেবে দেখি, শুধু সুন্দর কথাটিই সেসবের মধ্যে আমার মনে খুবমত গেঁথে গেছে। আমি গভীরভাবে ভাবতে থাকি, সুন্দর মানে ভালো, পৃথিবীটা অনেক সুন্দর, একদিন আমি তা দেখতে ও বুঝতে শিখবো। 

কিছুক্ষণের মধ্যে তামাম শব্দপাত আমার কাছে স্তব্ধ হয়ে আসে। গভীর মনোযোগে কান ফেলে আমি শুধু হৃদযন্ত্রে বেজে চলা পিপি সুরটি শুনতে পাই। হঠাৎ বোনটি এসে চমকে দেয় আমাকে। কান থেকে, বুক থেকে নিমিষে পালিয়ে যায় শব্দটি। বোনটি কথা বলে ওঠে, কী ভাবতেছিস? কী হয়েছে তোর? 

কিছু না। 

ওই যে কেমন করে কী যেন ভাবতেছিলি! 

না, কিছু ভাবিনি। 

আচ্ছা চল, বাড়ি চল। 

হুম। 

বাড়ি বলতে আসলে আমাদের কিছু নেই। বুবুর বর্ণনামতে  শহরের  অদূরের একটা হাটখোলার একপ্রান্তে ঝাঁকড়া এক বটগাছের নিচে খুঁপড়িঘর তোলা ক ঘর মানুষের সাথে আমাদের বাস। বোনটিই আমার সব। বয়সে সে আমার চেয়ে ক বছরের বড়। আমার সৎমা তাকে রেখে মারা যাবার দু'বছর পর বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমি অন্ধ হয়ে জন্মাই। আমার বয়স যখন এক বৎসর তখন মা মারা যান। তারও এক বছর পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে বাবা মারা যান। গাঁয়ে আমাদের একটাই ভিটাবাড়ি ছিল। বছর দুই আগে তা নদীগর্ভে বিলীন হলে অন্য ক'ঘর নদীভাঙা মানুষের সাথে আমরা দু ভাইবোন এসে ওই হাটখোলার প্রান্তে আশ্রয় নিই। সেই থেকে নিরুপায় বোনটি আমাকে প্রায় প্রতিদিন ভিক্ষার উদ্দশ্যে এখানে রেখে যান। এই দু' বছরে কোন ভাবনা আমাকে আজকের মতো এভাবে ভাবায়নি। প্রতিদিন বোনের হাত ধরে এখানে এসে বসেছি, দিনভর ভিক্ষা পেয়েছি।আবার বোনের হাত ধরেই দিনশেষে চলে গেছি আশ্রয়স্থলে। একইভাবে চলেছে জীবন। কেউ এভাবে কথা বলেনি, তাই ভাবার অবকাশ হয়নি জীবন কী, আমি কে- কেমন, জীবন সুন্দর, পৃথিবী সুন্দর, পিপি সুন্দর এইসব। ওই লোকটি তো বলে গেলেন তিনি সবই শেখাবেন আমাকে, আমি হৃদয়ের চোখ দিয়ে সব দেখতে পাবো -সুন্দর পৃথিবী ; সুন্দর পিপি কি দেখতে পাবো? কী সেটি? না না, সেটিতো হৃদয়চোখ দিয়েই দেখলাম - সেটি ভালো। ভালো মানে হচ্ছে সুন্দর! আমি আবারো সেই লোকটির আগমন প্রতীক্ষায় থাকবো। আচ্ছা, এরপর কবে আসবেন তিনি? বুবু কি বলতে পারবেন? নাহ, বুবু তো ছিলেনই না তখন। তাহলে এসব কথা বুবুকে বললে কেমন হয়? তার কাছ থেকেও তো জানা যায়। না থাক, সেই লোকটির থেকেই জানা যাক সব।                                                                                         নানা কথা ভাবতে ভাবতে বুবুর সাথে আশ্রয়স্থলে চলে আসি। সেদিন ঘুমাবার আগ পর্যন্ত আমি সারাক্ষণ ওসব কথাই ভেবেছি। পরবর্তী কদিন ভিক্ষায় বসে শুধু লোকটার কথা ভেবেছি, আর তার আগমন প্রত্যাশায় কান পেতে থেকেছি। কিন্তু আসছেন না তিনি। কেন আসছেন না? কবে আসবেন তিনি? নাকি আসবেন না আর? যদি আর কোনদিন না আসেন তবে কি আমার আর ভালো করে শেখা হবে না আমি কে -কী, দেখতে কেমন, পৃথিবী কী, সুন্দর কী, ওইসব কিছু, যা তিনি আমাকে শেখাবেন বলে কথা দিয়েছেন? 

অনেক দিন চলে গেল, অথচ তিনি আর এলেন না। প্রতিদিন আমি তার প্রতীক্ষায় অমনোযোগী থাকতে থাকতে প্রায় ভুলতেই বসি সেদিনে তার সেই কথাগুলোর প্রভাব। ভোলার পথ ধরে প্রতিদিন কী একটা ভারী ভাব বুকে অনুভব করতে থাকি। সেটিকে সুন্দর বলে ভাবতে ভাবতে প্রায়ই আমার কান্না পায়। বিমর্ষ হাঁটুতে মুখ গুঁজে থাকি -দৈনন্দিন জীবনে আমার আর বুবুর মধ্যকার কথা, যাদের সাথে হাটখুঁপড়িতে থাকি, তাদের কথা  ভেবে সময় কাটাতে থাকি। হঠাৎই একদিন দূরে পিপি শব্দটি শুনতে পেয়ে সচকিত  হই। যেদিক থেকে শব্দটি আসছে সেদিকে অনেক হই-হুল্লোড় হচ্ছে, বিশেষ করে আমার বয়সীদের। আমার পাশ থেকেই বয়ষ্ক মতো কেউ বললেন, ওই যে সেই বাদ্যযন্ত্রআলা আসছে। দেখো যত পয়পোলাপানের কায়কারবার। কেমন ঘিরা ধরছে তারে। আহা, কী মধুর বাজনা! যাই  আমিও যাই।                                                                                     

 আমি ভাবনাগ্রস্থ হাঁটুতে মুখ গুঁজে থাকি। ভাবি যদি আগন্তুক এদিকে না আসেন। কাকে বলব আমি? কে শুনবে আমার কথা তাকে ডেকে আনতে? আমি আবারো সচকিত হই। বাদ্যটা এখন এদিকেই আসছে। আমি মুখ খুলে হাসছি, আমার বুক ভিজে যাচ্ছে। বাজতে বাজতে আমার মুখোমুখি থেমে গেল বাদ্যটা। কিছুক্ষণ নীরব কাটল। আগন্তুক হয়তো আমাকে ভালোমত নিরীক্ষণ করলেন। আমিই বলে উঠলাম,আপনি এসেছেন? 

হ্যাঁ, এইতো এলাম। 

কতদিন পর এলেন! 

হ্যাঁ, তা আমার কথা ভেবেছ বুঝি? 

হ্যাঁ, অনেক করে। 

এবার আমি তোমাকে সব সুন্দরকে বুঝতে শেখাব। তুমি প্রস্তত তো? 

হ্যাঁ। 

যন্ত্রটা বাজাই তাহলে আবার, কেমন? 

হুম। 

ঠাঠ ঠাঠ ঠাটা ঠাটা ঠা টা - টা -টা- টা! কেমন লাগছে? ভালো? 

না। 

ভুল যন্ত্র বাজিয়েছি। এবারে শোনোঃ পিপ পিপ পিপি পিপি! পি ই- পি -পি -পি -ই ই ই ই! এবারে? 

ভালো। মনে রেখেছো তাহলে? সেটাই ভালো। ভালো মানে যেন কী? 

ভালো মানে সুন্দর? 

আমাদের পৃথিবী? 

সুন্দর।

কিছু কি অনুভব করছো? নতুন কিছু, যা আগে অনুভব করোনি। আগন্তুক খুব উচ্চক্ষমতার আলো ধরেছেন চোখে।

হুম, নতুন কিছু ---। আমি আমতা আমতা করি। 

এবারে? আগন্তুক আলোটি নিভিয়ে দেন। 

হুম, কিছু হয়তো হলো। কিছু ---।

বেশ চমৎকার! এ জবাবটিই আমি চেয়েছি। 

যন্ত্রটি আবার বাজাই, কেমন? শুনতে পাচ্ছো? 

না। 

আমি আসলে বাজাইনি। 

হিঃ হিঃ হিঃ!  

কী হলো এটা? কী করলে? 

হেসেছি। 

হাসতে ভালো লাগল, নাকি আগের অবস্থা? 

হাসতে। 

ভালোলাগা যেন কী? 

সুন্দর। 

তাহলে হাসি?  

সুন্দর। তাহলে বেশিক্ষণ হাসবো, নাকি মুখ ভার করে থাকবো আমরা? 

হাসবো। 

হাসি তবে কিছুক্ষণ - হো হাঃ হাঃ হাঃ! হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! এবারে বাদ্য বাজাই, কেমন? 

হুম। 

ভপ্ ভপ্, হলো না। বাজে না সেভাবে, নাহ! 

হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ! 

পি ই পি পি পি পি ই --পিউ পিপা পিপি পুপ পুপ পুপু পুপু! পপ প অ অ অ! কেমন হলো এবার? 

সুন্দর! 

তুমি কেমন থাকতে চাও? সুন্দর, নাকি অসুন্দর? 

সুন্দর! 

তুমি কি আমার মতো যন্ত্র বাজাতে চাও, নাকি যে কাজ করছো তাই করে যাবে? 

বাজাতে চাই। 

আগে তো বাজানো শিখতে হবে। তোমার কি তাতে ইচ্ছা আছে?  

হ্যাঁ।   

আমি একটি গানের সাথে যন্ত্রটি বাজাই। শুনতে শুনতে তুমি ভালোমত সিদ্ধান্তটি নাও। 

কোন সিদ্ধান্ত? 

ওই যে বাকি জীবন তুমি ভিক্ষে করবে, নাকি বাদ্য বাজাবে। বাদ্য বাজিয়েও তুমি উপার্জন করবে। কিন্তু  সেটি হবে অতি মহান এক পেশা। এবারে গান গেয়ে বাজাই, কেমন? 

হুম। 

থেকো না আঁধারে /পি ই পি পি পি

আলো ডাকে ওই /পপ পপ প পপ

হৃদয়দৃষ্টি খোলো /পি -----

যন্ত্রতালে বলো /প পপ---

আমি সূর্যপথিক /পি -ই-পি -

আলেয়ার নই /-------

এবারে কেমন লাগলো গানের সাথে যন্ত্র? 

ভালো, সুন্দর! 

সূর্যের কথা শুনেছ?

হ্যাঁ, আলো দেয়, বুবু বলেছেন। 

আলেয়া?  

না। 

আলেয়া হচ্ছে মিছে মায়া। 

সেটা কী? 

এই ধরো ভিক্ষা, যদি তোমাকে না বুঝাতাম, এটাকেই সুন্দর বা ভালো বলে জেনে তুমি চালিয়ে যেতে, কি যেতে না?

হুম। 

অথচ এটি পেশা নয়। আমি চাই ভিক্ষার মায়ায় না থেকে তুমি আমার  মতো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে উপার্জন করো। সেটিই হবে আলোর পথ, সূর্য তথা সুন্দরের পথ। আশা করি সে পথে হাঁটবে তুমি, কেমন? 

জি। 

তোমাকে আমি বাদ্যযন্ত্র শেখাবো। অন্ধদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে পড়াশোনাও শেখাবো। তারপর তুমি দেশের বড়বড় অনুষ্ঠানে বাজাবে। অনেক বড় হবে তুমি। আচ্ছা তোমার বুবু কখন আসবেন? 

পাঁচটায়। 

পাঁচটায় আমি আবার আসবো। তার সাথে কথা বলে আমি আজই সব বন্দোবস্ত করবো। ভেবো না। তোমার বুবুও সঙ্গে থাকবেন প্রতিদিন, তুমি যতক্ষণ প্রশিক্ষণ নাও, পড়াশোনা করো। তোমার মতো আরো অনেকেই আমার স্কুলে পড়াশোনা করেছে, করছে।চলি তবে এখন, কেমন? 

হুম।

পরদিন থেকে আগন্তুক আমাকে ও বুবুকে শহরের স্কুলে নিয়ে যান। অন্ধদের স্কুল সেটি। আমি ব্রেইল পদ্ধতিতে সপ্তাহে তিনদিন লেখাপড়া শিখি, তিনদিন গান ও বাদ্য শিখি। এভাবে ক বছর কেটে যায়। এখন আমি শহরের নামকরা গায়ক ও বাদক। বড়বড় সব অনুষ্ঠানে গাই ও বাজাই। তারচেয়েও বড় কথা দিনের পর দিন সেই মহান আগন্তুকের নিত্যনতুন মহান সব প্রশিক্ষণে আমার হৃদয়দৃষ্টিও খুলে গেছে। আমি এখন হৃদয়দৃষ্টি দিয়ে সবকিছু দেখতে পাই - নিজেকে, অন্যদেরকে, আমার প্রিয় বুবুকে, মহান আগন্তুককে। আমি আলো ও আঁধার দেখতে পাই, চন্দ্র সূর্য গ্রহ নক্ষত্রের অস্তিত্ব  টের  পাই। আমি বুঝতে পারি ফুল পাখি পাহাড় নদী সাগর কী। আমি  ভালোমন্দে পার্থক্য টের পাই। বুবুর মতে আমি এখন   অন্য সব স্বাভাবিক  মানুষের   মতোই খাইদাই ঘুমাই। আমার আগন্তুক প্রায়ই বলেন, এখন আমি পরিপূর্ণ এক মানুষ, আলোকিত আত্মার মানুষ। 'আলোকিত আত্মা' কথাটি কানে উঠলেই আমি আমার অন্ধ  চোখের সামনে আলো দেখতে পাই। তখন কী এক অজানা সম্মোহনে মনে হয় আমার  চোখ ও বুক এক। যখন এমনটি মনে হয় তখন  আমি খুব করে হাসতে চাই। অথচ প্রতিবার হাসতে গিয়ে   আমার বুক  ভিজে যায়। আমি নিয়মিত অনুষ্ঠানে গাইতে ও বাজাতে যাই। একদিনের কথা খুব করে আমার মনে পড়ে। সে কথাই বিশেষভাবে  বলছিঃ

No comments:

Post a Comment