Tuesday, September 21, 2021

ভূতকাঞ্চন - প্রবোধ কুমার মৃধা

ভূতকাঞ্চন
- প্রবোধ কুমার মৃধা

নাম কাঞ্চন,কাঞ্চন গায়েন।কিন্তু কাঞ্চন বললে সমসাময়িক প্রজন্ম চিনে উঠতে হোঁচট খেতে বাধ্য,কারণ কাঞ্চন নামের আগে ভূত শব্দটি উপসর্গের মতো যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছিল 'ভূতকাঞ্চন'।এক‌ই পাড়ায় বাড়ি, সম্পর্কে ছিল কাকা।আমরা তখন ছোট ছোট,কাঞ্চন কাকাকে দেখতাম মাছ ধরা ছিপ হাতে গাছ-গাছালির ছায়াতে অথবা ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে একেবারে নিঃসঙ্গ নির্জনে মাছ ধরায় ব্যস্ত।বাঁশ থেকে ১০-১৫ ফুটের ওপর বাখারি বের করে কাটারি দিয়ে ছুলে ছুলে মসৃণ এবং গোল আকৃতির লিকলিকে ডগা ওয়ালা ছিপ বানিয়ে সরুপ্রান্তে সুতো দিয়ে বঁড়শি ঝুলিয়ে দিনের পর দিন মাছ ধরা ছিল কাঞ্চন কাকার পেশা তথা নেশা।বর্ষার মরশুমে ধানের ক্ষেতে ক্ষেতে,বাকি মরশুমে বিলিতি পানা ভরা খানা ডোবায়।কখন যে কার পুকুর ধারে ঝোপের ভিতর আচমকা তার দেখা মিলত তা ছিল বড়ো চমকের ব্যাপার।
বড়ো হয়ে কাঞ্চন কাকার ভূতকাঞ্চন হয়ে ওঠার ইতিহাসটি আন্দাজ করতে পেরেছিলাম।কাকার চেহারাটি ছিল অদ্ভূত ধরণের; প্রচন্ড রোগা ,জুতস‌ই।লম্বা, ভীষণ ময়লা কঙ্কালাকৃতি।তবে তার এই ভূতকাঞ্চন নাম করণের স্রষ্টা কে বা কারা  তার সঠিক উৎস অজ্ঞাত রয়ে গেছে।
লোক চলাচলের সোজা পথে কাকাকে দেখতে পাওয়া যেত খুব কম।তবে প্রকাশ্য দিবালোকে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা দেখতে পেলেই ভয়ে উল্টো পথে দৌড় শুরু করত।তার উপর কাঞ্চন কাকার আবার বাচ্ছাদের দেখলে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে অঙ্গ ভঙ্গি করার ঝোঁক ছিল; সঙ্গে খ্যান খ্যেনে গলায়,'তবে রে,ধরতো রে,' আওয়াজে বাচ্ছাদের আত্মারাম খাঁচা ছাড়ার যোগাড় হতো।তখন কিন্তু কাঞ্চন কাকার দরদভরা তোলায়েম সুর,'ওরে সোনা রে,মনি রে,যা যা ঘরে যা,কচিরা ঘরে যা ', ইত্যাদি ইত্যাদি। ভয় দেখাবার উদ্দেশ্য তার মোটেই থাকত না,নিছক মজা করা।
দিনের বেলাতে বড়ো মানুষদের যেখানে ঢুকতে গা ছম্ ছম্ করত বা সচরাচর ঢুকত না ,পাড়ার বেড়াল কুকুর মরলে যেখানে ফেলা হতো ,সেই চারা চারা তাল খেজুরের ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে বিষাক্ত সাপের গর্তে ভরা পোড়ো জায়গায় রাতের অন্ধকারে বড়ো মাছের লোভে চারদিকে পায়খানা আর নানান পচা গন্ধের মধ্যে কাকা মাছ ধরতে‌ ঢুকত নিঃশব্দে।কোনদিন কোন কারণে কেউ দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে যেত।কাকার কিন্তু কিছুই ‌মনে হতো না।
      ‌‌‌‌     ছোটবেলায় শুনতাম ,ওই সমস্ত জায়গা ছিল গুয়ে ভূত আর মেছো ভূতদের আস্তানা।কতটা সত্য জানিনা,তবে তখন অসংশয়ে বিশ্বাস করতাম।এখন মনে করলে মনে মনে হাসি পায়।
আমাদের পাশের বাড়ির এক দম্পতির ছিল একটি মাত্র মেয়ে।তাও কিছুটা abnormal, মান্তু নামে পরিচিত ছিল। পাড়ার সবাই মেন্তু পাগলি বলেই ডাকত।ফরমায়েশ মতো কাজ কর্ম করে দিত,কথা বলত কম।সে যেমন ছিল লম্বা তেমনি ভীষণ ময়লা।পাড়ার রসিক জনেরা কথায় কথায় বলত,ভূত কাঞ্চনের সঙ্গে মেন্তু পাগলির বিয়ে দেওয়া হবে।হলে কিন্তু রাজযোটক হতো,দুজনের চেহারায় ছিল অদ্ভূত মিল।শেষ পর্যন্ত তা আর হয় নি।খুব অল্প বয়সে কাঞ্চন কাকা মারা যায়।
কাঞ্চন কাকার আদুল গায়ে ডান হাতে লম্বা ছিপ আর বাম হাতে গলায় দড়ি বাঁধা ঝোলানো ,মাছ রাখার মাটির ভাঁড় সমেত ঘাড় নিচু করে ধীরে ধীরে পথ চলার সেই সুপরিচিত ছবিটি এখন ও চোখে ভাসে।কতদিন হয়ে গেল, কত স্মৃতি আজ ও বেঁচে আছে।

No comments:

Post a Comment