Thursday, January 7, 2021

বাংলার পট ও পটুয়া - সৌম্য ঘোষ

বাংলার পট ও পটুয়া

- সৌম্য ঘোষ


       পটুয়া সমাজের পট বলতে যা বোঝায় , তা হলো লোক সমাজে প্রচলিত গান।  কাহিনী নির্ভর পট । জড়ানো পটের দৃষ্টান্ত হিসাবে আসে যম পট্টির কথা ।' যমপট্টি'র কথা আমরা পাই, সপ্তম শতকের প্রথম দিকে বানভট্ট রচিত "হর্ষচরিত" গ্রন্থে । যেখানে দেখা যাচ্ছে, মোষের পিঠে বসে থাকা যম । এখানে রয়েছে মৃত্যুভাবনা সঙ্গে ধর্মের কথা। পরবর্তীকালে নানা বিচিত্র দৃশ্যের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছিল লোকমুখে প্রচলিত বেশ্যা হীরামনির কাহিনী । বীরভূমের 'যমপট' ছিল বিখ্যাত । কাল ক্রমে পটশিল্পে জগন্নাথ অবতারের মাহাত্ম্য, গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এই পটুয়ারা ছিলেন হিন্দু সমাজের নিম্ন বর্ণের মানুষ। ‌ ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগে রচিত " ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ" - এ এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ‌ কাহিনীর কথা অনুসারে , মর্তে ব্রাহ্মণবেশী বিশ্বকর্মা ও গোপকন্যা রূপে দেব নর্তকী ঘৃতাচীর নয় পুত্রের মধ্যে চিত্রকারের উল্লেখ আছে ।  আবার আরেকটি সূত্র জানা যায়,  মঙঘলী ও ভদ্দার পুত্র ছিলেন গোসাল পটুয়া । তিনি নাকি প্রথম জাত পটুয়া । এক সময় তাঁকে হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ‌ আসলে সেটি ছিল হিন্দু উচ্চবর্ণের অত্যাচারের নিদর্শন ।  মুসলিম শাসনকালে বহু নিম্নবর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন । ধর্মান্তরিত পটুয়ারা মুসলিম ধর্মীয় রীতি মানলেও জাত পেশাগত দিক দিয়ে হিন্দু সমাজের সঙ্গ ছাড়তে পারেননি। পটে হিন্দু দেবদেবীর ছবি আঁকতেন। ‌ মুসলিমরা তা মেনে নিতে পারেনি। ‌ ফলে পটুয়া চিত্রকরেরা হয়ে গেল না-হিন্দু , না-মুসলিম ।

            পটুয়াদের মধ্যে মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলন যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল । হিন্দু সমাজে, সরা ও শোলার যে দুর্গা ও  লক্ষ্মী পূজা হয় , সেগুলি কিন্তু পটুয়াদের তৈরী নয় । এইসব পটগুলি তৈরি করেন সাধারণতঃ কুম্ভকার, মালাকার, সূত্রধর, ফৌজদার, আচার্য সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণ লোকেরা । এই চর্চা বংশ সূত্রে লব্ধ। 

           পট আঁকা নয় । পট লেখা হয়। অর্থাৎ চিত্রলেখা । একটা কাহিনীকে কাপড় বা কাগজের উপর রং তুলিতে প্রকাশ করা। প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে রং, আঠা সংগ্রহ করে নারকেলের মালায় গোলা হয় । কাঠবিড়ালি বা বেজির লোম বা ছাগলের ঘাড়ের লোম কঞ্চিতে বেঁধে তুলি প্রস্তুত করে নেওয়া হতো । 

         পটচিত্রে রেখা-রঙের আঞ্চলিকতাও লক্ষণীয় । অঞ্চল ভেদে পটচিত্র বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। মেদিনীপুর জেলার চিত্রিত চরিত্রগুলির চেহারা রুগ্ন। নবাবদের গুরুত্ব দিতে গিয়ে মুর্শিদাবাদের পটের বর্ণবৈচিত্রে রেখার সূক্ষ্মতা লক্ষণীয় ছিল। বাঁকুড়ায় লম্বাটে মুখ। আর বীরভূমে তুলনামূলক গোলমুখ এবং নেপথ্যে লাল রঙের ব্যবহার। এছাড়া বর্ধমান ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও পট তৈরি হতো ।

            এই প্রসঙ্গে আসা যাক , কালীঘাটের বিখ্যাত পট-কথা । কালীঘাটের চৌকো পটের
 শিল্পীরা আসলে একদল গ্রামীণ শিল্পী । কয়েকটি পটুয়া পরিবার তাদের সঙ্গে মিশে ছিল। ১৭৯৮ সালে কালীঘাটে মাকালীর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হবার পর সেখানে ভক্ত সমাগমের খবর শুনে জীবিকার সন্ধানে ধীরে ধীরে ভিড় জমে ওঠে। ১৮৩০ সাল নাগাদ চিত্রিত ছবির বাজার চাহিদা দেখে শ্রীরামপুরের পাতলা সস্তা কাগজ কিংবা চিনা কাগজ কিনে জল রঙের ব্যবহার করে চিত্রশিল্পের দিকে ঝুঁকতে শুরু করলো। প্রয়োজনে আলতা রঙের ব্যবহারও হয়েছে ।  পটের বিষয়বস্তু ছিল 
হিন্দু দেবদেবী, পৌরাণিক চরিত্র, দৈনন্দিন জীবনের নানা মুহুর্ত , সমাজের  বাবুদের নিয়ে ব্যঙ্গ দৃশ্য অথবা বেশ্যা- বারবনিতাদের চিত্র । পট চিত্রে অধিক গুরুত্ব পেত শিব-পার্বতীর লীলা , রামলীলা, ‌ কৃষ্ণলীলা , গৌরাঙ্গলীলা , মনসামঙ্গলের বেহুলা-লক্ষিন্দরের কাহিনী , চন্ডীমঙ্গলের কাহিনী, রাজা হরিশচন্দ্র-শৈব্যার কাহিনী  , সাবিত্রী-সত্যবানের কাহিনী, মাতৃভাবনা , শক্তি সাধনা ইত্যাদি ইত্যাদি। 

           মহাপুরুষদের মধ্যে ,  বিদ্যাসাগর বা ক্ষুদিরামের জীবন কথা নিয়ে পট অংকন হত। পটের বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছিলো  মাছের বিয়ে, আদিবাসী জন্মকথা, পণপ্রথা , ইংরেজ শাসকদের অত্যাচার ও বিদ্রোহের নানা দৃশ্য এবং সমসাময়িক নানা বিষয়।  ব্যাঘ্রবাহক ত্রাণকর্তা বরখাঁ গাজী ও সত্যপীরের বিজয় কাহিনী নিয়েও রচিত হত । 

           পুরাতন বাংলার সেই সনাতন চিত্র ও কৃষ্টি এখন প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে । পটের গান শোনার শ্রোতা এখন আর প্রায় পাওয়া যায় না বললেই হয়। পটুয়া পট দেখিয়ে গান করছে আর তাকে ঘিরে ভিড় জমে উঠেছে ,  সেই পুরাতন বাংলার সনাতন দৃশ্য আজ হারিয়ে গেছে । প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলাতেও আমরা এই দৃশ্য আজ আর খুঁজে পাইনা । পাশ্চাত্য সভ্যতার দাপটে পুরাতন বাংলার সেই অনাবিল কৃষ্টি, শিল্প কলা আজ প্রায় অবলুপ্ত।।

5 comments: