Wednesday, January 20, 2021

রসিক সুভাষচন্দ্র - মুক্তি দাশ [প্রবন্ধ]

রসিক সুভাষচন্দ্র

- মুক্তি দাশ


স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরযোদ্ধা নেতাজি সুভাষচন্দ্রের বহু ছবির মধ্যে তাঁর দৃঢ়প্রত্যয়ে ভরা সৈনিকবেশী ছবিটির সংগেই আমরা সমধিক পরিচিত। এই ছবি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, দেশের এতবড় মহান গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্রতী হয়ে বিশাল দায়িত্ব মাথায় নিয়ে সুভাষচন্দ্র কখনো রঙ্গরসিকতা করার সামান্যতম সুযোগ বা অবসর পেয়েছেন।

সুভাষচন্দ্রের লেখা বেশ কয়েকটি পারিবারিক চিঠিপত্রে নানা গুরুভার বিষয়বস্তুর ফাঁকফোকরে দমকা বাতাসের মতন হালকা মেজাজে লেখা কিছু টাটকা রসিকতা থেকে তাঁর সূক্ষ্ম পরিহাসপ্রিয় রসিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়।
 

তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মেজদা শরৎচন্দ্র বসুর পত্নী বিভাবতী বসুই তাঁর দমবন্ধ করা লড়াকু জীবনের একমাত্র জানালা। যাঁর সাথে দু’দন্ড কথা বলেও শান্তি। যাঁর কাছে তিনি স্বচ্ছন্দ, সাবলীল এবং নির্ভার।

বর্মার মান্দালয় জেল থেকে ‘মেজবৌদি’ অর্থাৎ শরৎচন্দ্র বসুর সহধর্মিনী বিভাবতী বসুকে ১৯২৫ সালের ৭ই আগস্ট তারিখে লেখা একটি চিঠিতে নানান দরকারি কথার মধ্যে সুভাষ একজায়গায় লিখেছেন –

“…আমাদের শাস্ত্রে একটা কথা আছে – মধ্বাভাবে গুড়ং দদ্যাৎ। অর্থাৎ যেখানে মধু-র অভাব, সেখানে গুড় দিয়ে মধু-র কাজ সারা উচিৎ। তাই ছোট ছেলেপুলের অভাব এখানে বেড়ালছানা দিয়ে মেটান হয়।…এখানে বেড়াল সবচেয়ে ভালবাসে যে লোকটি মেথরের কাজ করে – তাকে সবাই ‘ময়লা-লু’ বলে, তার আসল নাম ‘লবানা’। আর ময়লা সাফ করে বলে তার নাম সবাই রেখেছে ‘ময়লালু’। বর্মা ভাষায় ‘লু’ মানে লোক বা মানুষ। সে ময়লা সাফ করে, অতএব তার নাম ‘ময়লা লু’। ‘ময়লা লু’ কথাটা ভাল লাগে না বলে ‘ময়লালু’ – তার থেকে ভাল নাম দাঁড়িয়ে গেছে ‘মলয়’। আমাদের ‘মলয়’ যখন শোয় – তখন তার মাথার কাছে বেড়াল, বুকের উপর বেড়াল, পায়ের কাছে বেড়াল। চতুর্দিকে বেড়ালের পরিবারের দ্বারা পরিবৃত হয়ে সে ঘুমোয়।”

এ তো গেল ‘বেড়াল কাহিনী’। মুরগিরাও বাদ যায়নি কিন্তু। যেমন –

“…ম্যানেজারবাবুর কৃপায় এখানে আমাদের উঠানের এককোনে মুরগিশালা খোলা হয়েছে। সেই ঘরের মধ্যে কতগুলি মোরগ ও মুরগি স্থান পেয়েছে। সকাল সন্ধ্যা এইসব পক্ষবিশিষ্ট জীবের ‘কক্কর কোঁ’ শব্দে আমি অস্থির হয়ে উঠি – কিন্তু এই মধুর রব না শুনলে ম্যানেজারবাবুর নাকি ঘুম হয়না।”

এইসব মুরগি দেখাশোনার ভার দেওয়া হয়েছিল ‘ইয়াঙ্কা’ নামে মান্দ্রাজ অঞ্চলের অধিবাসী এক নিম্নশ্রেণীর কয়েদিকে। কিন্তু –

“গোড়া থেকেই ইয়াঙ্কা প্রভু ডিম সরাতে আরম্ভ করলেন। যেখানে ডিম হয় ৫/৬টা সেখানে ঘরে উঠে মাত্র ২/৩টা। বাকি কয়টা তাঁর কৃপায় অদৃশ্য হয়। যেদিন ধরা পড়লেন, সেদিন একেবারে নেকা। তাঁর বয়স মাত্র ৭১ বৎসর কিন্তু পেটটা অতিশয় বড়। অনেকে বলেন যে, তিনি ভোলানাথের অবতার। কারণ পেটটি একেবারে মহাদেবের মত। ইয়াঙ্কার কৃপায় প্রত্যহ মুরগির ছানা মরতে আরম্ভ করল। ১০/১২ থেকে দাঁড়াল তিনটা। সেগুলি এখনও পর্যন্ত জীবিত আছে, বোধহয় মরবার আর আপাতত আশা নাই। একদিন তার অযত্নের দরুণ চিল এসে ছোঁ মেরে একটি মুরগিছানা নিয়ে গেল। সকালবেলা যখন ধরা পড়ল তখন ইয়াঙ্কা সাধু সেজে বললেন, ‘মুসীতু’। অর্থাৎ ছিল না। অনেক ধমকা-ধমকির পর সত্য কথা স্বীকার করলেন।”

জেলখানার অভিজ্ঞতা সুভাষচন্দ্রের অপরিসীম। জীবনের বহু মূল্যবান সময় তাঁকে লৌহকপাটের অন্তরালে অতিবাহিত করতে হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সংস্পর্শে পুষ্ট হয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতার ভান্ডার। সেইসব অভিজ্ঞতার ছিটেফোঁটা লঘুরসে চুবিয়ে বেশ রসালো করে পরিবেশন করেছেন তাঁর অতিপ্রিয় মেজবৌদির কাছে লিখিত চিঠিপত্রে – তারই কিছু বিক্ষিপ্ত অংশ এখানে উদ্ধৃত করলাম।

No comments:

Post a Comment